৪১৬ কোটি টাকার কথিত ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলার তদন্তে জনতা ব্যাংকের সাতজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কাগুজে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে ঋণের অর্থ আত্মসাৎ এবং পরে তা বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানান্তর ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সম্প্রতি পাঠানো তলবি নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ১৯ জুলাই কমিশনে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নিতে বলা হয়েছে। তলব করা কর্মকর্তাদের মধ্যে জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), মহাব্যবস্থাপক এবং উপমহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
মামলার অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন দুদকের উপপরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বাধীন একটি তদন্ত দল।
এর আগে একই মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই জনতা ব্যাংকের আরও ১০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। তদন্তের অগ্রগতির অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি এই ঘটনায় মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তার ভাই এস এফ রহমান, তাদের দুই ছেলে, জনতা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ব্যাংকের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, পরস্পরের যোগসাজশে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিস, ঢাকার মাধ্যমে ইয়েলো অ্যাপারেলস লিমিটেড নামে নতুন গঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) সুবিধাসহ বিপুল পরিমাণ ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনায় পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এরপর তারা ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের (বিবি এলসি) মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই কাগুজে আমদানি-রপ্তানির লেনদেন দেখিয়ে ভুয়া বাণিজ্যিক বিল তৈরি করেন।
এভাবে মোট ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৭৮ হাজার ৬৭৯ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪১৬ কোটি ৩১ লাখ ৮৭ হাজার ৭১২ টাকার সমপরিমাণ, আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থ পরে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর, রূপান্তর এবং একাধিক ধাপে লেনদেনের মাধ্যমে এর প্রকৃত উৎস গোপনের চেষ্টা করা হয়, যা মানি লন্ডারিংয়ের শামিল।
তদন্তকারী সংস্থা বলছে, ঋণ অনুমোদন, অর্থ ছাড়, আমদানি-রপ্তানির নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বৈধতা যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণ বিতরণে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে গত দেড় দশকে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে বড় ধরনের দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ লুটপাট এবং বিদেশে অর্থ পাচারের নানা অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ও বেনামে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে নৌপথে পালানোর চেষ্টা করার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

