পণ্যবাহী জাহাজের নাবিকদের তীরে আনা-নেওয়ার আড়ালে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চলছে চোরাই তেলের বাণিজ্য—এমন অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জাহাজ থেকে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ রয়েছে, এই কার্যক্রম চালাতে সরকারি জমি দখল করে তৈরি করা হয়েছে একাধিক স্থাপনা।
শুধু তেল পাচার নয়, জাহাজের কিছু মাদকাসক্ত নাবিককে মাদক সরবরাহের মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও প্রভাবশালী চক্রের ভয়ে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী এলাকায় অবস্থিত পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশেও বিভিন্ন সময় বাধার মুখে পড়তে হয়।
নাবিক পারাপারের আড়ালে তেল পাচার:
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধানখালীতে নির্মিত পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা নিয়ে বিভিন্ন লাইটারেজ জাহাজ নিয়মিত পায়রা বন্দরের আওতাধীন নির্ধারিত জেটিতে আসে। এসব জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চোরাই তেল সরবরাহের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রায় এক মাসের অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি লাইটারেজ জাহাজ থেকে দায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তি অবৈধভাবে তেল সরিয়ে নিচ্ছেন। পরে স্থলভিত্তিক একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা বিক্রি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি জানান, নাবিকদের তীরে আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা ছোট ফাইবার বোর্ডগুলোতেই বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব বোর্ডে অতিরিক্ত তেল রাখার জন্য আলাদা কেবিনেট তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই জাহাজ থেকে কয়েক হাজার লিটার তেল তীরে আনা সম্ভব হয়। তার দাবি, জাহাজ থেকে প্রতি লিটার তেল ৭০ থেকে ৮০ টাকায় সংগ্রহ করে পরে স্থানীয় বাজারে প্রায় ১০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পায়রা বন্দরের ধানখালীর মরিচবুনিয়া এলাকার আরপিসিএল জেটি ঘাটসংলগ্ন খাসজমিতে কয়েকটি টিনের ঘর তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থানে চোরাই তেল সংরক্ষণ করে পরে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
তেল কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি জানান, জাহাজের কিছু নাবিক অর্থের পাশাপাশি মাদক দাবি করেন। তাদের মাদক সরবরাহ করা হলে সহজেই তেল সংগ্রহ করা যায় বলেও দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, স্থলপথে তেল পরিবহনের সময় মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার মুখে পড়তে হয়। তবে বৈধ কাগজপত্র দেখিয়ে অনেক সময় আটক করা তেল ছাড়িয়ে নেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগাযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পায়রা সমুদ্রবন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন শরীফ বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বন্দরের সীমানায় এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে কোস্টগার্ডের নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, বিষয়গুলো বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, থানা পুলিশের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সত্য নয় এবং ভিত্তিহীন। এ ধরনের বিষয় মূলত নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডের আওতাধীন। তিনি বলেন, থানা পুলিশ কিছু তেল আটক করেছিল। পরে সংশ্লিষ্টরা বৈধ কাগজপত্র দেখানোর পর মালিকপক্ষকে তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

