বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ডিজিটাল প্রতারণা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত প্রায় দুই হাজার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর/এসএআর) শনাক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পাঁচ বছরে ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে ৬ হাজার ১৪৪ কোটিরও বেশি টাকা জমা এবং প্রায় ৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা উত্তোলন হয়েছে। ২০২০ সালে যেখানে এমন সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০টি, ২০২৪ সালে তা ২১ গুণ বেড়ে যায়। বিএফআইইউর বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার এবং আর্থিক খাতের নজরদারির সীমাবদ্ধতার কারণে এ ধরনের লেনদেন দ্রুত বাড়ছে।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণেও উদ্বেগের কারণ দেখা গেছে। অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল প্রতারণা এখন আর শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে সীমাবদ্ধ নেই। সাতক্ষীরা, নওগাঁ, রাজশাহী, বগুড়া, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, ফেনী এবং ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায়ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চাকরিজীবীদের হিসাবের মাধ্যমে ৬৪১ কোটির বেশি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, নিয়মিত আয়ের একটি অংশও নিষিদ্ধ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে গৃহিণী, কৃষক, জেলে, শিক্ষার্থী, দিনমজুর এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবেও কয়েকশ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, এ ধরনের অপরাধচক্র সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত হয়েছে।
সন্দেহজনক অর্থের উৎস ও প্রবাহ অনুসন্ধানে একাধিক জটিলতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। একটি কেস স্টাডিতে দেখা যায়, খুচরা দোকান হিসেবে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে মাত্র এক বছরে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা জমা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অর্থ এসেছে ৮৯টি অনলাইন গেমিং ও বেটিং ওয়েবসাইট থেকে।
আরেকটি ঘটনায়, একজন ব্যক্তির হিসাবে দুই বছরে ১৪৩ কোটি টাকা জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তে সেখানে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা হিসাব, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন, স্বর্ণ চোরাচালান এবং হুন্ডির সংশ্লিষ্টতা শনাক্ত হয়েছে।
বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে অপরাধচক্র দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের জন্য দেশের আধুনিক পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করছে। সাধারণ মানুষের লেনদেন সহজ করতে তৈরি হওয়া এই প্রযুক্তিই এখন অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ও অর্থ পাচারের বিভিন্ন ধাপ আরও দ্রুত সম্পন্ন করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থায় একজন গ্রাহক তুলনামূলকভাবে সহজেই বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন করতে পারেন। কিন্তু সেই লেনদেন তার আয়, পেশা বা ব্যবসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা শুরুতেই শনাক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা এখনো সীমিত। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক আর্থিক কার্যক্রম দীর্ঘ সময় নজরের বাইরে থেকে যায়। উদাহরণ হিসেবে, একটি ছোট খুচরা দোকানের হিসাবে মাত্র এক বছরে ৫৩ কোটি টাকা এবং অস্তিত্বহীন একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে দুই বছরে ১৪৩ কোটি টাকা জমা হওয়ার ঘটনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ধরনের লেনদেন যদি শুরুতেই স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থার আওতায় আসত, তাহলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।
দেশের ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এখনো মূলত প্রতিক্রিয়াভিত্তিক। অর্থাৎ সন্দেহজনক লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিবেদন তৈরি ও তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে লেনদেন ঠেকানোর সক্ষমতা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
আইনগত কাঠামোও এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া ও বেটিং দণ্ডনীয় অপরাধ। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের এফই সার্কুলার-২৪ অনুযায়ী দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি স্বীকৃত মুদ্রা নয়। তবে আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তব প্রয়োগে নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। কারণ, অপরাধীরা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করায় তাদের শনাক্ত করা এবং অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা অনেক ক্ষেত্রে জটিল হয়ে পড়ে। তাই কেবল আইন প্রয়োগ বা ঘটনার পর তদন্তের ওপর নির্ভর না করে, লেনদেনের প্রাথমিক পর্যায়েই কার্যকর নজরদারি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরছেন।
এ প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও প্রতিরোধমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকের ঘোষিত আয়, পেশা ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী লেনদেনের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা চালু হলে অসংগতিপূর্ণ লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে হিসাব খোলার সময় ই-কেওয়াইসি যাচাই আরও কঠোর করা এবং বিশেষ করে ব্যবসায়িক হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অস্তিত্ব ও কার্যক্রম নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এনপিএসবি, আরটিজিএস ও বিইএফটিএনের মতো দ্রুতগতির পেমেন্ট ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক বা ঘন ঘন বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে সাময়িক স্থগিতাদেশ বা অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে স্বল্প সময়ে একাধিক হিসাবে অর্থ ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কমে আসবে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ ব্যাংক, সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার এবং এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সমন্বিত একটি গোয়েন্দা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি। এতে কোনো একটি সন্দেহজনক হিসাব শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান দ্রুত সতর্ক হতে পারবে। পাশাপাশি অনেক ভুক্তভোগী আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না করায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া সহজ করাকেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। সিআইডি এ পর্যন্ত চারটি পৃথক ঘটনায় অভিযান চালিয়ে ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হাজারো সন্দেহজনক হিসাব এবং ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেনের প্রেক্ষাপটে এ অগ্রগতি এখনো সীমিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, কেবল আইন প্রয়োগ বা গ্রেপ্তার অভিযানের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর মতো সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে সন্দেহজনক লেনদেন শুরু হওয়ার আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশে ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা যত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়ন্ত্রক কাঠামোকেও আরও শক্তিশালী করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের আর্থিক সেবা সহজ করার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা এই অবকাঠামোই অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ও অর্থ পাচারের জন্য অপরাধচক্রের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

