বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ সচল রাখতে ব্যবহৃত ট্র্যাকশন মোটর কেনা ও মেরামত ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং ভ্যারিয়েশনের নামে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর মতো বিষয়। এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রেলের কর্মকর্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্রাংশ কেনা ও মেরামতের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সুবিধা নিয়ে আসছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
লোকোমোটিভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ট্র্যাকশন মোটর। বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে এই মোটর ট্রেনের চাকা ঘোরাতে সহায়তা করে। ফলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে ট্র্যাকশন মোটরের মান ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রেলের পূর্বাঞ্চলের (সিআরবি) চিফ কন্ট্রোলার অব স্টোরস কার্যালয়ের আওতায় ২ হাজার ৩০০, ২ হাজার ৪০০, ৬ হাজার ও ৬ হাজার ১০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ৩৪টি ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের জন্য চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এ কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন:
দরপত্রের শুরুতে বলা হয়েছিল, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের রেলের কোনো কার্যক্রমে ৩০ লাখ টাকা সমমূল্যের ক্রয় বা নির্মাণকাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে পরে সেই যোগ্যতার শর্ত বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, হঠাৎ করে অভিজ্ঞতার সীমা বাড়ানোর কারণে অনেক দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যায়। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিযোগ রয়েছে, এবারের দরপত্রে এমন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোট কাজের মূল্যের প্রায় ৫০ শতাংশ সমপরিমাণ কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিতে বলা হয়। রেলের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই শর্ত কঠিন করা হয়েছে।
রেলের নথি অনুযায়ী, কারিগরি উপকমিটির মূল্যায়নের পর ‘শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’কে ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের কাজ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৫২ হাজার ৬০৪ টাকায় কার্যাদেশ পায়। এ ক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি দরে কাজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্র্যাকশন মোটরের বাইরে রেলের বড় প্রকল্পগুলোতেও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক। বিশেষ করে ২০০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ এবং ১৫০টি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্পে ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুমোদন ছাড়াই পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং এতে সরকারি অর্থের অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া অনুমোদন ছাড়া এয়ার ব্রেক ব্যবহারের অভিযোগ এবং বদলি বাণিজ্যের বিষয়েও দুদকে অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকল্পের বিল-ভাউচার, নথিপত্র এবং অনুমোদন সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে।

