রংপুরের বদরগঞ্জে যমুনেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরাতে নদী থেকে বিপুল পরিমাণ বালু তুলে বিক্রি করছে একটি সিন্ডিকেট। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে ভাঙন ঝুঁকি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের অভিযান, মামলা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের পরও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে এই কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাতভর চলে নদী কাটার কাজ:
সরেজমিনে বদরগঞ্জ উপজেলার অরুন্নেছা-নাগেরহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কুতুবপুর সোটাপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় দুটি অবৈধ বালুমহাল গড়ে উঠেছে। সেখানে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী কার্যালয়। সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয় বালু উত্তোলনের কার্যক্রম, যা চলে ভোর পর্যন্ত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যমুনেশ্বরী নদীর প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় বড় তিনটি বালুমহাল এবং আরও কয়েকটি ছোট বালু উত্তোলন কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে। এসব স্থান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন ও বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাত নামলেই নদীর তীরে বাড়তে থাকে ট্রাক্টর ও ডাম্প ট্রাকের আনাগোনা। আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে নদীর বুক থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে বালু। ভোর হওয়ার আগেই চলে যায় উত্তোলন করা বালুভর্তি যানবাহন।
বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ, বাড়ছে ভাঙন:
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে যমুনেশ্বরী নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে ভাঙন। এতে আবাদি জমি ও বসতবাড়ি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ভাঙা জুম্মা গ্রামের বাসিন্দা খন্দকার মোস্তাফিজার বলেন, বালু পরিবহনের কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর গতিপথেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য ফারুক মিয়ার অভিযোগ, বালু উত্তোলনকারীরা প্রশাসনের নির্দেশনাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ এই বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এ কাজে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন তারা। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কারণে অনেকে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তীরে শতাধিক শ্রমিক বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কাজে ব্যস্ত। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রশিদুল ইসলাম লেবু বলেন, তিনি বা যুবদলের কেউ অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নন। মধুপুর ইউনিয়নের সামছুল ইসলাম বলেন, তিনি জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত নন এবং বালু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। জাতীয় পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা রুবাইয়েত ইসলামও দাবি করেন, বালু বিক্রির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, নিয়মিত অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এই কার্যক্রম চলতে দেওয়া হচ্ছে।
তবে বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনজুমান সুলতানা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বদরগঞ্জে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, মামলা ও অভিযান চলার পরও যদি রাতের আঁধারে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ না হয়, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কখন নেওয়া হবে।

