সাইবার হামলার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে হ্যাকারদের মূল লক্ষ্য ছিল কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, এখন তারা নজর দিচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের দুর্বল অংশে। এতে একটি প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে একযোগে বহু প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকের নেটওয়ার্ক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সাপ্লাই চেইনভিত্তিক হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি নতুন এবং জটিল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ ধরনের হামলায় হ্যাকাররা বিশ্বস্ত সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার অথবা তৃতীয় পক্ষের সেবাদাতার মাধ্যমে ক্ষতিকর কোড প্রবেশ করায়। এরপর সেই প্রবেশপথ ব্যবহার করে একসঙ্গে বহু প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা দুর্বল হলে তার সঙ্গে যুক্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলই ঝুঁকিতে পড়ে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ডার্কট্রেসের নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ন্যাথানিয়েল জোন্স বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারলে হ্যাকাররা একসঙ্গে হাজারো প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারে। এ কারণেই তারা এখন সরবরাহ শৃঙ্খলকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মোবাইল অপারেটর ভেরাইজনের বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ সালে বিশ্লেষণ করা ২২ হাজারের বেশি তথ্য ফাঁসের ঘটনার প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অনুপ্রবেশের কারণে। আগের বছরের তুলনায় এ ধরনের ঘটনা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
পালো অল্টো নেটওয়ার্কসের যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড অঞ্চলের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা স্কট ম্যাককিননের মতে, ছোট কোনো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বড় প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করা এখন হ্যাকারদের জন্য অনেক সহজ। এ কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলভিত্তিক হামলা তাদের কাছে আরও কার্যকর ও লাভজনক কৌশলে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েক বছরে আলোচিত কয়েকটি সাইবার হামলা এই ঝুঁকির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২০ সালে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা আইটি প্রতিষ্ঠান সোলারউইন্ডসের ওরিয়ন সফটওয়্যারে ক্ষতিকর কোড সংযুক্ত করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৮ হাজার গ্রাহক সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে পড়ে।
একই ধরনের ঘটনার শিকার হয় ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার। গত বছর স্ক্যাটার্ড স্পাইডার নামে পরিচিত একটি হ্যাকার গোষ্ঠী তৃতীয় পক্ষের এক সরবরাহকারীর মাধ্যমে কোম্পানিটির নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের হামলার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। কারণ এআইয়ের সহায়তায় হ্যাকাররা দ্রুত সফটওয়্যার কোড বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছে। এতে হামলার গতি যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এর বিস্তারও।
এ পরিস্থিতিতে শুধু নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
গুগলের মালিকানাধীন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যান্ডিয়ান্ট কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্টুয়ার্ট ম্যাকেঞ্জির পরামর্শ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত সফটওয়্যারের উপাদানগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা সফটওয়্যার বিল অব ম্যাটেরিয়ালস (SBOM) প্রস্তুত করা উচিত। এতে ঝুঁকিপূর্ণ সফটওয়্যার দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
এ ছাড়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, নিয়মিত নিরাপত্তা দুর্বলতা মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির ধারাবাহিক নজরদারির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন ধীরে ধীরে এ ধরনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে হ্যাকাররাও প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। তাই সাইবার নিরাপত্তায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, দ্রুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সমন্বিত প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

