দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্যাম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত এখন বাংলাদেশি নাগরিকদের মানবপাচারের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। তুলনামূলক সহজে ভিসা পাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র। ভালো বেতন ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের এই পথে নিয়ে গিয়ে পরে নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যে ভিসা করিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে পর্যটক হিসেবে ক্যাম্বোডিয়া বা থাইল্যান্ডে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের অনেককে জোরপূর্বক সাইবার প্রতারণা, অনলাইন অপরাধ এবং অমানবিক শ্রমে যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি থাইল্যান্ডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া, লাওসসহ আশপাশের দেশগুলোতে পাচারের ঘটনাও বাড়ছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশিকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে গত মার্চে থাইল্যান্ডের ইয়াই ও সংখলা এলাকা থেকে ১৬ বাংলাদেশিকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে দেশটির পুলিশ। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, পাচারকারীরা তাদের কয়েক দিন খাবার ও পানি ছাড়া আটকে রেখেছিল। উন্নত জীবনের আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে গিয়ে কত বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন, তার সঠিক হিসাবও নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাচারকারীরা সাধারণত উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের টার্গেট করে। প্রথমে বৈধ ভিসার মাধ্যমে থাইল্যান্ড বা ক্যাম্বোডিয়ায় নেওয়ার পর দুর্গম সীমান্ত এলাকা ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করে অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। পথে আটক হওয়া অনেক বাংলাদেশি এখন বিভিন্ন দেশের কারাগারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
ব্যাংককে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান, থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আটক বাংলাদেশিদের খোঁজ নেওয়া এবং তাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। সীমিত জনবল নিয়ে কারাগার পরিদর্শন, সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, ট্রাভেল পাস ইস্যু এবং দেশে ফেরানোর কাজ করতে হচ্ছে দূতাবাসকে।
বিশেষ করে ক্যাম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস না থাকায় সেখানে বিপদে পড়া নাগরিকদের সহায়তা দিতে থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে তাদের পরিবারও দীর্ঘদিন কোনো তথ্য পায় না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাবেক কর্মকর্তা আসিফ মুনীর বলেন, থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার ভিসা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই রুটকে ব্যবহার করছে মানবপাচারকারী চক্র। কম খরচে বিদেশে পাঠানো এবং বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। পরে তাদের বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত হতে বাধ্য করা হয়।
তিনি বলেন, এসব চক্র আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংগঠিত এবং অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে কার্যক্রম চালায়। ক্যাম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় সেখানকার সমস্যায় পড়া নাগরিকদের সহায়তা কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ভুয়া ভিসা ও প্রতারণার মাধ্যমেও অনেক বাংলাদেশিকে থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ায় নেওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের একটি অংশকে সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন অবৈধ কাজে বাধ্য করা হয়। পরে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আটক হয়ে তারা কারাগারে যায়।
সূত্র আরও জানায়, ক্যাম্বোডিয়ায় বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টার ও ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সরকারের অভিযানের পর সেখানে কর্মরত অনেক বিদেশি কর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আবারও সক্রিয় হয়েছে পাচারকারী চক্র। তারা বেকার বাংলাদেশিদের নতুন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সম্প্রতি রাজধানীর বনশ্রী-সংলগ্ন আফতাবনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ক্যাম্বোডিয়াভিত্তিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম সদস্য মাহাফুজ উল্লাহ সিদ্দিকীকে (৪০) গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মাহাফুজ উল্লাহ বিমানবন্দর থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশে দায়ের করা মামলার আসামি। প্রাথমিক তদন্তে তাকে ক্যাম্বোডিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচার এখন আর কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। এই অপরাধ দমনে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাদের মতে, পাচারকারী চক্র এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, নকল ভিসা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। তাই বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

