রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে যন্ত্রপাতি কেনাকাটা ও বিভিন্ন ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বিশেষ নিরীক্ষায়। সরকারি মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে সরঞ্জাম কেনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। শুধু এই একটি ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।
দেশের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) বিশেষ নিরীক্ষায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে ২৩০টি অডিট আপত্তি দেওয়া হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নয় অর্থবছরে রূপপুর প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন আর্থিক অসঙ্গতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে। ফলে প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের আওতায় দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। শুরুতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রথম অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরে ব্যয় প্রায় ২২ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষ নিরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আপত্তি উঠেছে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্প নিয়ে। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের থাকার জন্য নির্মিত এই আবাসন এলাকায় মোট ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টি আপত্তি পাওয়া গেছে। এসব আপত্তির বড় অংশই নির্মাণকাজ, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং বিল পরিশোধসংক্রান্ত।
নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আবার কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে মোট দরকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্যের তথ্য পাওয়া গেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা। কিন্তু একই সরঞ্জাম কেনার জন্য বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
একটি ভবনের সরঞ্জাম কেনার হিসাবেও এমন অস্বাভাবিক ব্যবধান পাওয়া গেছে। উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম, ট্রান্সফরমার, নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, পাওয়ার ফ্যাক্টর সংশোধন প্যানেল এবং জেনারেটরের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। কিন্তু এসব সরঞ্জামের জন্য বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ একটি ভবনের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
রূপপুর প্রকল্পের আলোচিত বালিশ কেনাকাণ্ডও বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়। এর মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছিল ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। এসব বালিশের প্রকৃত মূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, কিন্তু কেনা হয়েছে ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বালিশ কেনার ঘটনা ছিল অনিয়মের একটি ছোট অংশ। গ্রিন সিটির ২০টি আবাসিক ভবনের নির্মাণ ও ক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রায় ২৯৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ এবং চুক্তির শর্ত না মানার অভিযোগ করা হয়েছে।
শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটির পরিদর্শনে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর জন্য প্রকল্প কার্যালয়ে কোনো হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা নেই। একই সঙ্গে অসমাপ্ত কাজের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়নি।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিলম্বের আশঙ্কা রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের প্রতি বছর প্রকল্প বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পর আর কোনো নতুন কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও নতুন পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় আইএমইডি দ্রুত হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা সংগ্রহ, অসমাপ্ত কাজের তালিকা প্রস্তুত, নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে।
এ বিষয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিধিগত দুর্বলতার বিষয়টি সামনে আনে। সরকারি ক্রয় আইন ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়।
তিনি বলেন, বিষয়টিকে শুধু প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ক্রয়প্রক্রিয়া, তদারকি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রূপপুর প্রকল্পে নিরীক্ষায় পাওয়া অনিয়মগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার। তার মতে, প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিরীক্ষায় উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।

