চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে ভাঙার জন্য আমদানি করা তিনটি বিদেশি স্ক্র্যাপ জাহাজে লুটের ঘটনা ঘটেছে। ২৯ জুন থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত এসব ঘটনায় দস্যুরা জাহাজগুলো থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকার মালামাল নিয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এর মধ্যে একটি জাহাজ থেকে লুট হওয়া প্রায় দুই কোটি টাকার সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে ঘটনার ২২ দিন পার হলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। এতে জাহাজ মালিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক।
নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে এ ঘটনায় নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। বুধবার দেওয়া ওই চিঠিতে বহির্নোঙরে থাকা জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। চিঠিটি দেন সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
রাতের আঁধারে জাহাজে হানা:
বন্দর সূত্র জানায়, গত ২৯ জুন রাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের চার্লি অ্যাংকরেজে অবস্থান নেয় ‘এমভি হাই জু’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ। সীতাকুণ্ডের ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য জাহাজটি আমদানি করা হয়েছিল। জানা যায়, রাত ১টার দিকে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল জাহাজটিতে উঠে পড়ে। তারা স্পেয়ার পার্টসসহ প্রায় এক কোটি টাকার সরঞ্জাম নিয়ে যায়।
এর পরদিন একই এলাকায় থাকা ‘এমটি আইরোস’ নামের আরেকটি জাহাজে হামলা চালানো হয়। সীতাকুণ্ডের যমুনা শিপ ব্রেকার্সের আমদানি করা এ জাহাজ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি লুট করা হয়। পরে পতেঙ্গা থানা পুলিশ কিছু মালামাল উদ্ধার করে।
সর্বশেষ ১৬ জুলাই ভোরে লুটের শিকার হয় সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘তাই শুয়েনে’। দস্যুরা জাহাজটির ডেক থেকে মুরিং রোপ, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম নিয়ে যায়। এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য চার কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, দস্যুরা জাহাজে ওঠার পরপরই ক্যাপ্টেনরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্ট গার্ডকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিযোগ। তাদের দাবি, মামলা করলে নানা ধরনের আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেকেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
নৌমন্ত্রীর কাছে দেওয়া চিঠিতে আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিক্যাপের (আরইসিএএপি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেছে চট্টগ্রাম চেম্বার। চিঠিতে বলা হয়, রিক্যাপের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে দস্যুতা বা চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের জলসীমায় এমন ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ওই সময়ে নিরাপদ ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বিত তৎপরতার কারণে এ সাফল্য এসেছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম সদরঘাট নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুর রব বলেন, এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। এ ধরনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সাধারণত কোস্ট গার্ড গ্রহণ করে। পতেঙ্গা থানার ওসি মো. পারভেজ জানান, একটি জাহাজ থেকে চুরি হওয়া মালামালের একটি অংশ ১ জুলাই নৌ থানা পুলিশের সহযোগিতায় বাংলাবাজার এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রিফায়েত হামিম বলেন, স্ক্র্যাপ জাহাজে চুরি বন্ধে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, যৌথ টহল জোরদার এবং কোস্ট গার্ডকে প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া। তিনি জানান, বহির্নোঙরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মতো দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত জাহাজ চলাচলে আস্থা ধরে রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

