জ্বালানি খাতে সামিট গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) কাছে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধানী দল অভিযোগ যাচাই করতে এসব নথি সংগ্রহ করছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো পৃথক চিঠিতে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন সংস্থাটির উপপরিচালক ও যৌথ অনুসন্ধান টিমের প্রধান মো. আলমগীর হোসেন।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, সামিট গ্রুপ-সংক্রান্ত দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে একটি বিশেষ দল কাজ করছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিপিসি ও বিউবোর কাছে কিছু রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে। নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদক সূত্র জানায়, সামিট পাওয়ার লিমিটেডের জ্বালানি ব্যবহারকারী বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আইপিপি) জন্য আমদানি করা এইচএফও বা ভারী জ্বালানি তেলের বিভিন্ন খরচের হিসাব যাচাই করতে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে, বিপিসি নির্ধারিত ফরম্যাট অনুযায়ী জ্বালানি ব্যয়ের উপাদান সম্পর্কিত নথি, বিউবো ও সামিট পাওয়ার লিমিটেডের মধ্যে হওয়া চুক্তির আওতায় জ্বালানি আমদানি-সংক্রান্ত অনুমোদন বা ছাড়পত্রের তথ্য এবং বিকল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির অনুমতির রেকর্ড।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি জ্বালানি চালানের হিসাবপত্র, মূল সারসংক্ষেপ, আমদানি করা এইচএফওর ক্ষেত্রে নির্ধারিত হ্যান্ডলিং কমিশন, বন্দর ও নদীবন্দর ব্যবহারের ফি এবং জরিপ ফি-সংক্রান্ত অনুমোদিত হার ও নীতিমালার তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
দুদক আরও চেয়েছে আমদানি করা জ্বালানি তেলের টার্মিনাল চার্জ ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংক্রান্ত নথি। পাশাপাশি সামিট পাওয়ারের এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি জ্বালানি চালানের হিসাব, বিল অব লেডিং, লন্ডন ট্যাংকার ব্রোকারস প্যানেল সনদ, ব্যাংক পরামর্শপত্র এবং বন্দর ফি-সংক্রান্ত সত্যায়িত কাগজপত্রও চাওয়া হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সামিট গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, দুর্নীতির মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া এবং অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই বিশেষ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এর আগে একই অনুসন্ধান কার্যক্রমের আওতায় প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে একটি মামলা করেছে দুদক। ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট দুদকের সহকারী পরিচালক নাছরুল্লাহ হোসাইন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
মামলায় সরকারের ১০ কোটি ২৪ লাখ ৫২ হাজার ৬৫২ টাকা রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফরিদ খানসহ মোট সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্যানেল আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাকিব, সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদ এবং সাবেক কয়েকজন কমিশনার।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্যানেল আইনজীবীর সহযোগিতায় সামিট কমিউনিকেশনস বেআইনিভাবে ১৪ কোটি ২০ লাখ ৮৮ হাজার ১৩৬টি নতুন সাধারণ শেয়ার ইস্যু করে।
এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক গ্লোবাল এনার্জিকে ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৮৮ হাজার ৯১১টি শেয়ার দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি মুহাম্মদ আজিজ খান ও তার পরিবারের মালিকানাধীন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মরিশাসভিত্তিক সেকুওয়া ইনফ্রা টেক লিমিটেডকে ৪ কোটি ৪ লাখ ৯৫ হাজার ১১৯টি শেয়ার এবং আগের শেয়ারহোল্ডার মো. আরিফ আল ইসলামকে ৭১ লাখ ৪ হাজার ৪০৬টি শেয়ার দেওয়া হয়।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৫ কোটি ৭ লাখ থেকে বেড়ে ১৯ কোটি ২৮ লাখে দাঁড়ায়। এতে কোম্পানির মূলধন কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে এবং মোহাম্মদ ফরিদ খানের মালিকানা ৯৫ শতাংশ থেকে কমে ২৫ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে দুই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিকানা ৭০ শতাংশে পৌঁছায়।
দুদকের অভিযোগ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ অনুযায়ী শেয়ার হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিক্রি হওয়া শেয়ারের মূল্যের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে সামিট কমিউনিকেশনসের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়—এমন মতামত দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সংস্থাটির দাবি, ওই মতামতের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শেয়ার অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, যার ফলে সরকার প্রায় ১০ কোটি ২৪ লাখ টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
দুদক বলছে, বিপিসি ও বিউবোর কাছ থেকে পাওয়া নথিপত্র বিশ্লেষণের পর জ্বালানি খাতে সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

