হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে ব্যয় নিয়ে নতুন করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনুমোদন ছাড়া প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার ব্যয়, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ এবং ভেরিয়েশনের নামে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ৫০০ টাকার একটি চারা গাছের মূল্য প্রকল্প নথিতে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা এটিকে ২০১৯ সালের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ডের’ সঙ্গে তুলনা করছেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন গাছ লাগানো হয়েছে। এসব গাছের একেকটির দাম ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। অথচ বিমানবন্দরসংলগ্ন নার্সারিতে একই ধরনের গাছ ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। গাছ কেনায় প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং পরিচর্যার জন্য আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়মের পর এসব ব্যয়কে পরবর্তী অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হলে তা জবাবদিহির জন্য বড় হুমকি তৈরি করবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়মকে পরবর্তী সময়ে অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হলে সেটি আরেক ধরনের দুর্নীতি হবে। প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের পরিবর্তে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে অনিয়মের দায় নির্ধারণ, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প এলাকায় আগে থেকেই থাকা একটি জলাশয়কে পুকুর হিসেবে দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মাটি পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রকৃত দূরত্বের চেয়ে বেশি দূরত্ব দেখিয়ে ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের আংশিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য চুক্তির বাইরে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়, ডিজেল পাম্প সরবরাহে প্রায় ১২ কোটি টাকা, ইউপিএস সরবরাহে ৪৮ কোটি টাকার বেশি এবং জ্বালানি তেলে ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত কাজের জন্য অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয়ের সুযোগ থাকলেও এই প্রকল্পে প্রায় ২৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ৬৩০টি আইটেম পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা যথাযথ অনুমোদন ছাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৭ সালে নেওয়া তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম প্রকল্পটির ঠিকাদার। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা।
অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ডিসপিউট বোর্ড ও সমঝোতা কমিটি গঠন করেছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, যাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে, তাদের কয়েকজনকে এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সরকারি অর্থ অপচয়ের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।

