অনুষ্ঠানের দিন হল ছিল সাজানো। অতিথিরা এসেছেন, আয়োজন শেষ করে চলে গেছেন। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানের কোনো তথ্য নেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সরকারি হিসাবের খাতায়। এক-দুটি নয়, মাত্র চার মাসে এমন ২৩টি অনুষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে (কমিউনিটি সেন্টার)।
অভিযোগ উঠেছে, এসব অনুষ্ঠানের বিপরীতে আদায় করা ভাড়া করপোরেশনের তহবিলে জমা হয়নি। অর্থাৎ অনুষ্ঠান হয়েছে, হল ব্যবহার হয়েছে, কিন্তু সেই আয়ের হিসাব রয়ে গেছে আড়ালে।
ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় বিষয়টি উঠে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের তদারকির দায়িত্বে থাকা সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান ও তত্ত্বাবধায়ক অমরেশ মন্ডল রতন। যদিও করপোরেশনের নথিতে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং অনিয়মের মাধ্যমে হারানো অর্থ উদ্ধারের সুপারিশ করা হয়েছে।
দুই রেজিস্টারের তথ্যে গরমিল:
ঘটনার সূত্রপাত দুটি আলাদা হিসাবের খাতা যাচাই করতে গিয়ে। ডিএসসিসির নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের কেয়ারটেকারের রেজিস্টারে ১৩১টি অনুষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। এসব অনুষ্ঠান থেকে ৩৬ লাখ ৮০ হাজার ৯০০ টাকা জমা দেওয়ার হিসাব দেখানো হয়েছে।
তবে একই সময়ের ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার পর্যালোচনা করে আরও ২৩টি অনুষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যায়। এসব অনুষ্ঠানের কোনো উল্লেখ ছিল না কেয়ারটেকারের রেজিস্টারে।
দুই হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, চার মাসে মোট ১৫৪টি অনুষ্ঠান হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে করপোরেশনের হিসাবের খাতায় রয়েছে ১৩১টি, আর ২৩টি অনুষ্ঠান রয়ে গেছে হিসাবের বাইরে।
ডেকোরেটরের তথ্য অনুযায়ী, এসব অনুষ্ঠান ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের বিভিন্ন দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোনোটি দিনে, আবার কোনোটি রাতে। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলা—দুই জায়গাতেই আয়োজন করা হয়েছে অনুষ্ঠান। এমনকি একই দিনে একাধিক অনুষ্ঠান হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা আদায়ের তথ্য:
সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ভাড়া দিতে হয়। এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিল, শীতাতপনিয়ন্ত্রণের খরচ, পানির বিল এবং ভ্যাটও যুক্ত হয়। ফলে ২৩টি অনুষ্ঠানের বিপরীতে করপোরেশনের কত টাকা পাওয়ার কথা ছিল, তার চূড়ান্ত হিসাব এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় এসব অনুষ্ঠান থেকে হলভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও ভ্যাটসহ সম্পূর্ণ অর্থ আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২৩টি অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল। তবে ওই অর্থ করপোরেশনের হিসাবের খাতায় জমা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিএসসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাইদুর রহমান নিজেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। এ কারণে অনেকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে দ্বিধা বোধ করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাইদুর রহমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি। তত্ত্বাবধায়ক অমরেশ মন্ডল রতনও অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের কিছু অনুষ্ঠান হয়েছিল। এসব অনুষ্ঠানের ভাড়া আদায় করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। অন্য একটি সূত্রের দাবি, করপোরেশনের একটি পক্ষ বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিপাকে ফেলতে পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সেই প্রক্রিয়ায় কিছু কর্মকর্তা জড়িয়ে পড়েছেন।
ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় শুধু অর্থ উদ্ধারের সুপারিশই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজনে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে।
তিনি বলেন, কোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করতে সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রগুলোর জন্য দ্রুত অনলাইন বুকিং ব্যবস্থা চালু করা হবে।

