কর পরিপালনের ঘাটতি কমানো, বকেয়া আদায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় ৯৯০ বিলিয়ন টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো কর পরিপালনের ঘাটতি কমানো, কর ফাঁকি শনাক্ত করা, বকেয়া রাজস্ব আদায় জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা। এই পরিকল্পনা সফল হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুধু মূল্য সংযোজন কর থেকেই প্রায় ৯৯০ বিলিয়ন টাকা অতিরিক্ত আদায় সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে কর পরিপালনের ঘাটতি কমানো। এ উদ্দেশ্যে প্রায় ১০ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের ধারণা, এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, হিসাব যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৩৮০ বিলিয়ন টাকা মূল্য সংযোজন কর আদায় করা সম্ভব হবে।
সোমবার অনুষ্ঠিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক বৈঠকে এই কৌশলগত পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. রাশিদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। সেখানে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য মূল্য সংযোজন কর বিভাগের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৮ হাজার এমন প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের ক্ষেত্রে কর পরিপালনের ঘাটতি বেশি অথবা কর ফাঁকির ঝুঁকি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে অতিরিক্ত ২৫০ বিলিয়ন টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি বছরে ১০ মিলিয়নের বেশি টাকা মূল্য সংযোজন কর পরিশোধ করে এমন আরও ২ হাজার বড় করদাতাকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে। এই উদ্যোগ থেকে নিয়মিত করের বাইরে অতিরিক্ত ১০০ বিলিয়ন টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
এই দুই উদ্যোগ মিলিয়ে অতিরিক্ত ৩৫০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর বাইরে কর পরিপালন আরও উন্নত করতে নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপ থেকে অতিরিক্ত ৩০ বিলিয়ন টাকা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে কর পরিপালন জোরদারের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৩৮০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানের মাসিক লেনদেন ১ মিলিয়ন টাকার বেশি এবং যেগুলো মূল্য সংযোজন করের আওতাভুক্ত, সেখান থেকেই এই তালিকা তৈরি করা হবে। এতে আমদানিকারক, আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান, উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় পর্যায়ে পণ্য ও সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা এবং অন্যান্য নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বৈঠকে উপস্থিত এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের কর পরিপালনে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, এসব ঘাটতি দূর করা গেলে অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে এবং সরকারের রাজস্বভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
বিশেষ করে আবাসন খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনে অসঙ্গতি শনাক্ত করা গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে একটি শীর্ষস্থানীয় আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৭ দশমিক ০ বিলিয়ন টাকার অপরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর শনাক্ত করা হয়েছে। এই ধরনের অনিয়ম খুঁজে বের করতে বিশেষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পৃথক দলও গঠন করা হয়েছে, যারা শুধু আবাসন খাতের লেনদেন পর্যবেক্ষণ করবে।
তবে সরকারের পরিকল্পনা শুধু কর পরিপালন জোরদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের আরও কয়েকটি বড় উৎসও নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে বিড়ি ও সিগারেট শিল্প থেকে অতিরিক্ত ১২০ বিলিয়ন টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় ১০ শতাংশ সম্প্রসারিত হলে স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন টাকা মূল্য সংযোজন কর আদায় হবে বলে হিসাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন আরও গতিশীল হলে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে বাজারে লেনদেনও বাড়বে। এর প্রভাবে অতিরিক্ত ১৫০ বিলিয়ন টাকা রাজস্ব সংগ্রহের সম্ভাবনা দেখছে সরকার।
বকেয়া আদায়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাত থেকে মোট ১৪০ বিলিয়ন টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সুদ গণনার সময়সীমা কমিয়ে ৭০ বিলিয়ন টাকা এবং অন্যান্য বকেয়া থেকে আরও ৭০ বিলিয়ন টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে কর পরিপালন নিশ্চিত করা, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, বকেয়া আদায় বৃদ্ধি, উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমন্বয়ে প্রায় ৯৯০ বিলিয়ন টাকা অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন কর সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ০৪ ট্রিলিয়ন টাকা। এটি আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি এবং স্বাধীনতার পর এক অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু মূল্য সংযোজন কর বিভাগকেই আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং কর পরিপালন নিশ্চিত করে এবং কর ফাঁকি কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করা দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর পদ্ধতি। তবে এই পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভরভাবে নজরদারি পরিচালিত হয় তার ওপর। একই সঙ্গে সৎ করদাতারা যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত কর ফাঁকিদাতাদেরই জবাবদিহির আওতায় আনা যায়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

