বাংলাদেশের অন্তত ১৮টি সীমান্ত জেলার ১০৫টি পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে। এসব মাদকের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫’-এ এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাদক চোরাচালানের প্রধান তিনটি করিডোর রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে মূলত ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইন আসে। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় করিডোর দিয়ে সবচেয়ে বেশি ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ পাচার হয়।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ২৭১ কিলোমিটার। পশ্চিমাঞ্চলীয় করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় করিডোরে রয়েছে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা।
অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী টেকনাফ, উখিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, তুমব্রু, ঘুমধুম, কুতুপালং ও সেন্টমার্টিন দ্বীপকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ পাচারের সবচেয়ে সক্রিয় ও ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে উল্লেখ করেছে ডিএনসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চোরাকারবারিরা শুধু স্থলসীমান্ত নয়, নদীপথ ও উপকূলীয় রুটও ব্যবহার করছে। দেশে প্রবেশের পর কুরিয়ার সার্ভিস, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মাদক পরিবহনে অপরাধীরা নানা কৌশল অবলম্বন করছে। কখনও ইয়াবা ট্যাবলেট শরীরের ভেতরে বহন করা হচ্ছে, আবার কখনও জুতা, লাঠি বা যানবাহনের টায়ারের মধ্যে লুকিয়ে আনা হচ্ছে। এমনকি নারী ও শিশুদেরও মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম বলেন, গাঁজা ও ফেনসিডিলের প্রধান উৎস ভারত, আর ইয়াবা আসে মূলত মিয়ানমার থেকে। তার ভাষ্য, ইয়াবা পাচারে অনেক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবহার করা হয় এবং বর্তমানে দেশে জব্দ হওয়া মাদকের বড় অংশই ইয়াবা।
ঢাকাকে মাদকের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মাদক ব্যবসায়ীরা বেশি জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম রয়েছে—এমন এলাকাকেই বাজার হিসেবে বেছে নেয়। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ ও তুলনামূলক বিত্তশালী এলাকাগুলোয় মাদকের চাহিদা এবং অর্থের প্রবাহ বেশি হওয়ায় সেগুলোই প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ মাদকাসক্তের মধ্যে প্রায় ২৩ লাখই ঢাকায় বসবাস করেন।
প্রতিবেদন আরও বলছে, এলএসডি ও এমডিএমএর মতো সিনথেটিক ও সাইকোঅ্যাকটিভ মাদকের বিস্তার নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব কৃত্রিম মাদকের ব্যবহারকারী ও চোরাকারবারিদের বড় অংশের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইয়াবা ও অন্যান্য অ্যামফিটামিনজাতীয় ট্যাবলেট জব্দের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪ কোটি ৩৫ লাখে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ। তবে একই সময়ে হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ও কোকেন জব্দের পরিমাণ কমেছে।
ডিএনসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রবেশ করা ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের প্রায় ৮০ শতাংশ দেশেই ব্যবহৃত হয়। বাকি অংশ ছোট ছোট চালানে বিমানবন্দর ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। অন্যদিকে কোকেনসহ কিছু মাদকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে মূলত ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং পরে সেগুলো ভারতে পাঠানো হয়।
ডিএনসির এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, কক্সবাজার ও যশোর বর্তমানে মাদক চোরাচালানের দুটি প্রধান প্রবেশদ্বার। কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, তুমব্রু, ঘুমধুম, কুতুপালং ও সেন্টমার্টিন দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ আসে। অন্যদিকে যশোরের বেনাপোল, পুটখালী, চৌগাছা, নারায়ণপুর ও শার্শা সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইন পাচার করা হয়।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ মানেই কোথাও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েছে। একবার মাদক দেশে ঢুকে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, ইয়াবা কারবারি আব্দুর রহমান বদির মতো আর কোনো বড় মাদক সম্রাটের উত্থান না হওয়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সাফল্য।
অন্যদিকে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলার ভৌগোলিক অবস্থান এবং স্থানীয় অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততার কারণে মাদক চোরাচালান দমন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তার মতে, অনেক সময় অসাধু ব্যক্তি, প্রভাবশালী মহল বা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় এসব নেটওয়ার্ক ভাঙা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে করণীয় সম্পর্কে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা বলেন, যেহেতু মাদক প্রবেশের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলো চিহ্নিত রয়েছে, তাই সেখানে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কঠোর তদারকির আওতায় আনা এবং পুরস্কার-শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, চোরাকারবারিরা এখন ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গোপনে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে।
ডিএনসির প্রতিবেদনে সংস্থাটির সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জনবল সংকট, আধুনিক মাদক শনাক্তকরণ প্রযুক্তির অভাব, যানবাহনের স্বল্পতা এবং গোয়েন্দা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি আদালতে মামলার জট, দুর্বল তদন্ত, আলামত সংরক্ষণে ঘাটতি এবং সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানোর কারণে বহু মাদক মামলা বছরের পর বছর নিষ্পত্তিহীন থেকে যাচ্ছে।
ডিএনসির অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দিন বলেন, সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়েই সংস্থাটি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে ডিএনসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ১৬ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে সংস্থার সক্ষমতা আরও বাড়বে। নতুন আইনের আওতায় ডিএনসির নিজস্ব সাইবার ইউনিট ও ডগ স্কোয়াড গঠন, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভিযান পরিচালনার বিস্তৃত ক্ষমতা এবং থানাগুলোতে মাদক মামলার জন্য পৃথক ডেস্ক চালুর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

