হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যয় বাড়ানো, অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, অনুমোদন ছাড়া খরচ এবং বিভিন্ন নথিতে অসঙ্গতির মাধ্যমে এই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিটি ধাপেই তৈরি হয়েছে অনিয়মের সুযোগ। দেশি-বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রায় ৬ হাজার পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র, বিল-ভাউচার, ভেরিয়েশন আদেশ, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, ঋণসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং প্রকল্প নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব নথিতে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বে থাকা সরকারের আমলেও একই ধরনের আর্থিক অনিয়মের ধারাবাহিকতা পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
কয়েক দফায় বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়:
তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে ভ্যাট, কর ও শুল্ক বাদে মূল প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।
পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়তে থাকে। প্রথমে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংশোধন করা হয় প্রকল্পটি। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় আবার সংশোধন করা হলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকায় অর্থাৎ মূল প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এই বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশই অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছে প্রায় ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এ অর্থ পরিশোধে সহায়তা করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ ছাড়া দেশীয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশে আরও ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে বেবিচকের বিরুদ্ধে। একটি সরকারি নিরীক্ষায় এরই মধ্যে ৬ হাজার ৩২৩ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। এর বাইরে অনুসন্ধানে আরও ২ হাজার ১১৮ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও কাজকে সমর্থন দিয়েছে বলে নথিতে উঠে এসেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরামর্শক কনসোর্টিয়ামের দায়িত্ব পালনে ঘাটতির কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্প সংশোধনের সময় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বাধ্যতামূলক অনুমোদন ছাড়াই আগে ব্যয় করা ৩ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমান বিএনপি সরকারও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জন্য আরও ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের আগেই অর্থায়ন, পরামর্শক নিয়োগ, বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও ব্যয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে বিভিন্ন পরিবর্তন, কাজের পরিধি বাড়ানো এবং সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে প্রকল্প দীর্ঘায়িত হয়। এতে নতুন দর নির্ধারণ, অতিরিক্ত কাজ এবং বাড়তি অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আগের সিদ্ধান্তগুলোকে বৈধতা দিতে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও প্রতিষ্ঠানের মতামত নেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ঋণের বোঝা এখন করদাতাদের:
তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা জাইকা অর্থায়ন করছে। বাকি অর্থ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)। জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন, ফুজিতা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে গঠিত এই প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ করছে।
প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে রয়েছে এনওসিডি জয়েন্ট ভেঞ্চার। এতে রয়েছে নিপ্পন কোয়েই, ওসি গ্লোবাল, সিপিজি ও ডিডিসি। প্রকল্পের আওতায় তৃতীয় যাত্রী টার্মিনাল ছাড়াও ট্যাক্সিওয়ে, উড়োজাহাজ পার্কিং এলাকা, কার্গো টার্মিনাল, উড়াল সংযোগ সড়ক এবং বহুতল গাড়ি পার্কিং ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের কারণে এখন প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল ব্যয়ের পর টার্মিনালটি প্রত্যাশিত যাত্রীসেবা দিতে পারবে কি না এবং কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় সম্ভব হবে কি না।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক, বেবিচক কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, পরামর্শক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অনেকেই এখনও বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত রয়েছেন। এদিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও এ প্রকল্পের কথিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত শুরু করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সরকারি নিরীক্ষা সংস্থাগুলো অনিয়মের বিষয়গুলো সামনে আনার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের (এডিসি) কাছ থেকে অতিরিক্ত পরিশোধ করা প্রায় ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে দাবি তোলে বেবিচক। তবে এরই মধ্যে চুক্তিতে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে যায়।
প্রকল্পের বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্পন্ন হওয়া কাজের অনুমোদিত মূল্য বিবেচনায় এডিসিকে অতিরিক্ত ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর বড় অংশই এসেছে অনুমোদন ছাড়া ভেরিয়েশন অর্ডার বা চুক্তির শর্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে।
‘রাজনীতিক-আমলা-ব্যবসায়ী চক্রের যোগসাজশে দুর্নীতি’:
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত প্রভাবের মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। তিনি বলেন, স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্প থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।
ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এই ঘটনায় শুধু দেশীয় পক্ষ নয়, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তার ভাষ্য, প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে জাইকার ভূমিকা ছিল। তাই জাইকাসহ সংশ্লিষ্ট সব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও খতিয়ে দেখা দরকার।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, আগের সরকারগুলোর সময় প্রকল্পে এসব অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার সরকার বিষয়গুলো যাচাই করছে এবং দায়ীদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দায়ীদের চিহ্নিত করার আগে সরকার কেন তৃতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) নিয়ে এগোচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন।
মন্ত্রী বলেন, শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ঋণের দায় জনগণকেই বহন করতে হবে। তাই একদিকে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে দ্রুত টার্মিনাল চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এবং বেবিচকের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে প্রকল্প পরিচালক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রকল্পের স্টিল স্ক্রুড পাইল (এসএসপি) ব্যবস্থাপনার ঘটনাটি ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে বিভিন্ন অনুমোদন ও ভেরিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
দরপত্র প্রক্রিয়ার সময় মাটি পরীক্ষা ছাড়াই ১ হাজার ৬৯৯টি এসএসপি ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষায় এসব পাইল কার্যকর নয় বলে জানানো হলে প্রথম ভেরিয়েশন আদেশের মাধ্যমে এসএসপির পরিবর্তে বোরড পাইল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বেবিচকের একটি সূত্রের অভিযোগ, নির্দিষ্ট একটি দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই এসএসপি ব্যবহারের শর্ত রাখা হয়েছিল।
২০২০ সালে প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির নথিতে বলা হয়, নতুন নকশার কারণে চুক্তিমূল্য বাড়বে না। এই তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পরিবর্তিত পরিকল্পনা অনুমোদন করে। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ দাবি করে, নতুন নকশার ফলে ৮০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছে। তবে একই সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১২৫ কোটি টাকার ‘ওমিশন চার্জ’ তৈরি করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর দাবি থাকলেও বাস্তবে নতুন নতুন খরচ যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভেরিয়েশনের নামে হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়:
প্রকল্প চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, কোনো ভেরিয়েশনের কারণে চুক্তিমূল্য ১ শতাংশের বেশি বাড়লে অথবা কাজের পরিমাণ ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেলে বেবিচকের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।
তবে প্রকল্পের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরবর্তী সময়ে ৬৭৩টি ভেরিয়েশন আদেশ এবং আটটি ভ্যালু ইঞ্জিনিয়ারিং কার্যক্রমের মাধ্যমে মোট ৩ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার অতিরিক্ত কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়। এই অর্থ মূল বরাদ্দের তুলনায় ২ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা বেশি।
নথিতে আরও দেখা গেছে, স্টিল স্ক্রুড পাইল (এসএসপি) পরিবর্তনের বিষয়টি বাদ দিলে ৫০ কোটি টাকার বেশি কোনো ভেরিয়েশন আদেশ সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বাধ্যতামূলক অনুমোদন পায়নি। পরে দ্বিতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (আরডিপিপি) মাধ্যমে এসব অনুমোদনহীন ব্যয়কে বৈধতা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পের ব্যয় ও চুক্তি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চলতি বছরের ৭ এপ্রিল সরকার ১০ সদস্যের একটি আপস নিষ্পত্তি কমিটি গঠন করে। অভিযোগ রয়েছে, ওই কমিটির নয়জন সদস্যই কোনো না কোনোভাবে অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। নথি অনুযায়ী, এডিসির দেওয়া তথ্য এবং এনওসিডি জয়েন্ট ভেঞ্চারের প্রত্যয়নকে ভিত্তি করে কমিটি ১৬ হাজার ২২৫ কোটি টাকার চুক্তিমূল্য অনুমোদন করে। এর ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
২০২৫ সালে দ্বিতীয় আরডিপিপি অনুমোদনের আগে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের বাড়তি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ বিষয়ে মতামত চাওয়া হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি)-এর কাছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মের সময় প্রকল্পের সর্বোচ্চ তদারকি দায়িত্বে থাকা এই প্রতিষ্ঠানই পরবর্তীতে বিতর্কিত ব্যয়ের পক্ষে অবস্থান নেয়।
প্রকল্পের টপ সুপারভিশন দলের দলনেতা মো. শামসুল হক একটি চিঠির মাধ্যমে মতামত দেন। নথিতে ওই চিঠির কোনো সূত্র বা রেফারেন্স উল্লেখ ছিল না। তারপরও সেটিকে বুয়েটের আনুষ্ঠানিক মতামত হিসেবে গ্রহণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিঠিতে বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ও আর্থিক অনিয়মের বিষয় স্বীকার করা হলেও দায় দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক পরামর্শকের ওপর। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, বেবিচকের অনুমোদন ছাড়া পরামর্শক নতুন দর নির্ধারণ বা টেকিং-ওভার সার্টিফিকেট (টিওসি) দেওয়ার সুযোগ ছিল না। এ কারণে বেবিচকের সিদ্ধান্ত ও নিজেদের তদারকি দুর্বলতার বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে বুয়েট বিতর্কিত ব্যয়কে বৈধতা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া মো. শামসুল হক প্রকল্পের বিরোধ নিষ্পত্তি বোর্ডের অ্যামিকাস কিউরি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে বোর্ডের চূড়ান্ত বৈঠকে তিনি ৪২ মিনিট দেরিতে উপস্থিত হন। এর আগেই গুরুত্বপূর্ণ দাবি, ব্যয় এবং চুক্তিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষ হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুল হক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তৃতীয় আরডিপিপিতে আবারও বাড়ছে ব্যয়:
বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে ৬ হাজার ৩২৩ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তি তুলেছে। ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত তৃতীয় আরডিপিপি পর্যালোচনা সভায় পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আগে এসব আপত্তি নিষ্পত্তির শর্ত দেয়।
এ ছাড়া মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের নিরীক্ষায় ২৭টি খাতে ৪ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকার অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, সরকারি ক্ষতি এবং আদায়যোগ্য অর্থ শনাক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরীক্ষায় যেসব বিষয় উঠে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে—
- যাচাই ছাড়া বা অসঙ্গত বিলের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ
- বাস্তবে সম্পন্ন কাজের চেয়ে বেশি কাজ দেখিয়ে অর্থ দেওয়া
- অনুমোদন ছাড়া কাজের পরিধি পরিবর্তন
- চুক্তির বাইরে বাড়তি দর নির্ধারণ
- মাটি অপসারণের পরিমাণ নিয়ে অসংগত দাবি
- উপঠিকাদারদের কাজে অতিরিক্ত মুনাফা
- সরকারি অর্থ থেকে পরামর্শকদের কর পরিশোধ
এ ছাড়া উৎপাদনকারী দেশের শর্ত পরিবর্তন করে কম দামের পণ্য আনা হলেও চুক্তিমূল্য কমানো হয়নি বলে নিরীক্ষায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নিরীক্ষা আপত্তির নিষ্পত্তি না হওয়া, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত না করা এবং অর্থ উদ্ধার না হওয়ার পরও তৃতীয় আরডিপিপি পরবর্তী একনেক সভায় উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির নির্মাণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে। তবে এখনও চালু হয়নি দেশের সবচেয়ে বড় এই বিমানবন্দর টার্মিনাল। কর্তৃপক্ষ এখন ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনালটির আংশিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ

