বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার ইতিহাসে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিম এক অনন্য নাম। মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও বারডেম হাসপাতাল। সময়ের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান দেশের লাখো মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠেছে। তাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও এর অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, প্রকল্পের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার, অস্বাভাবিক ব্যয় এবং কর্মীদের চাকরিচ্যুতির মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই প্রয়োজন হলেও একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগ। একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ হওয়া জরুরি। কিন্তু যদি নিয়োগে অনিয়ম, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আর্থিক লেনদেন প্রাধান্য পায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে গেলে প্রশাসনিক দক্ষতা কমে যায়, সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।
অনুসন্ধানে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগও উঠে এসেছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার পরিবেশ না থাকে, তাহলে সেখানে জবাবদিহির সংকট তৈরি হয়। প্রতিবাদকারীরা যদি হয়রানি, বদলি বা চাকরি হারানোর আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে অনিয়ম আরও গভীরে শেকড় গেড়ে বসে।
বারডেমের ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোরও যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কোনো নির্দিষ্ট খাতে হঠাৎ অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি হলে তার কারণ স্পষ্ট করা জরুরি। একইভাবে প্রকল্পের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা কিংবা নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বাধা তৈরির অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
একটি অলাভজনক ও মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটি যদি ঋণের চাপে থাকে, তাহলে সেই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো, কারা এর জন্য দায়ী—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও বারডেমের দীর্ঘদিনের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য বা অতীত সাফল্য বর্তমানের অনিয়মের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিতে পারে না। বরং প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা আরও জরুরি।
এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আর্থিক নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত।
বারডেম ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জায়গা নয়। এসব প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে মানুষের সেবার জন্য। তাই অনিয়মের কোনো চক্র থাকলে তা ভেঙে দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও সেবার মূল আদর্শে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ এর সঙ্গে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নয়, জড়িয়ে আছে অসংখ্য রোগীর আস্থা ও দেশের স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ।

