দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার মতো কারণগুলো এই খাতকে ক্রমশ আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায়, যার ফলে একাধিক প্রতিষ্ঠান এখন তারল্য সংকটে ভুগছে এবং সময়মতো গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রান্তিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের এনবিএফআই খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৮ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি বা মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণই প্রায় ১৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা—অর্থাৎ মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় চব্বিশ শতাংশই এখন আদায়ের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে এই খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিকে এই খাতে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে গত চার বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, ২০২১ সালের শেষদিকে এই অঙ্ক ছিল মাত্র ১৩ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি—যা স্পষ্টভাবেই বলে দেয়, বিগত কয়েক বছরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণমানের অবনতি কতটা তীব্র হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে সুশাসনের ঘাটতি ও অনিয়মের অভিযোগ চলে আসছে। পরিচালকদের অতিরিক্ত প্রভাব, নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ, আদায়ে শৈথিল্য এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে বিতরণ করা ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফেরত আসছে না। এর ফলে একদিকে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে, অন্যদিকে আয় কমে যাওয়ায় প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও বাড়ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তথ্যমতে, অন্তত দশটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না, যার মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি পরিচিত লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানি। করোনাকালে ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় এই খাতের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়, আর পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসতে থাকায় আমানতকারীদের একটি অংশ টাকা তুলে নেওয়া শুরু করেন, যা তারল্য সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। এই খাতের অনিয়মের প্রসঙ্গে বহুল আলোচিত এক সাবেক ব্যবসায়ীর নামও বারবার উঠে এসেছে, যার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে একাধিক মামলা ও তদন্ত পরিচালিত হয়েছে।
ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতাও বাড়ছে, যা মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। আমানতকারীরা অর্থ ফেরত চাইলে সেই চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়, ফলে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও কমে আসছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা বা নতুন তহবিল সরবরাহ করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেখানে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি ঋণ আদায়ে জোরালো উদ্যোগ, সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের সুপারিশও উঠে এসেছে বিশ্লেষকদের পক্ষ থেকে।
একজন ব্যাংকখাত বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু নীতিগত সুবিধার কারণে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে সাময়িক স্বস্তির আভাস মিললেও এই খাতের মৌলিক দুর্বলতা এখনও কাটেনি। কঠোর তদারকি ও ঋণশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে যাবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। তার মতে, অনিয়মে জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারিও আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
একজন অর্থনীতিবিদের পর্যবেক্ষণ, বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতায়। তাই সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি, তবে সতর্ক করেছেন যে নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের নিরুৎসাহিত করে এমন কোনো সুবিধা যেন খেলাপিদের দেওয়া না হয়। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক নীতির মাধ্যমেই কেবল খেলাপি ঋণ, ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ ও প্রভিশন ঘাটতির এই জটিল সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব।

