রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দুই সরকারি আবাসিক এলাকা মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনির পুরনো ভবন, ফাঁকা জায়গা ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব এলাকায় কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তৎপরতা বাড়ছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়া অনেক ভবন ও নির্জন স্থান অপরাধীরা নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করছে। এর প্রভাব পড়ছে মতিঝিল, নিউমার্কেটসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিরাপত্তায়।
মতিঝিলের এজিবি কলোনিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নানা অপরাধের অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কলোনির বড় আয়তন, পুরনো ভবন ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অপরাধীরা সেখানে সহজে লুকিয়ে থাকতে পারে।
গত ১৭ জুলাই পুলিশ তানিম রেজা ওরফে বাপ্পী নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মতিঝিল এলাকায় চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ব্যবহার ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার নাম জড়িয়েছিল। তার কিশোর বয়সের সময় এজিবি কলোনির মাঠ থেকেই একটি কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বলেও স্থানীয়রা জানান।
দেশভাগের পর সরকারি কর্মচারীদের আবাসনের জন্য মতিঝিলে এজিবি কলোনি নির্মাণ করা হয়। প্রায় ২৮৪ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এ কলোনিতে রয়েছে ১৬৫টি চারতলা ভবন এবং তিনটি ২০ তলা ভবন। এখানে স্কুল, মাদরাসা ও কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় কলোনির অনেক ভবন এখন জরাজীর্ণ। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল এবং অনেক জায়গায় ঝোপঝাড় তৈরি হয়েছে। প্রবেশপথে গেট থাকলেও নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বাসিন্দাদের দাবি, সন্ধ্যার পর বহিরাগত কিশোর-যুবকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। অনেক সময় মাদক সেবন, আড্ডা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া যায়।
মতিঝিলের এক ব্যবসায়ী বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এখানে চাঁদাবাজি ও অপরাধীদের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তার মতে, অপরাধীরা দিনের বেলায় কলোনির ভেতরে অবস্থান করে এবং রাতে আশপাশের এলাকায় অপরাধ ঘটিয়ে আবার সেখানে ফিরে যায়।
রাজধানীর আরেক পুরনো সরকারি আবাসিক এলাকা আজিমপুর সরকারি কলোনিতেও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
১৯৪৭ সালের পর সরকারি কর্মচারীদের আবাসন সংকট মোকাবিলায় নির্মিত এ কলোনির আয়তন প্রায় ৮৫ একর। বিভিন্ন সময়ে এখানে ১৪৯টি ভবন নির্মাণ করা হয়। পুরনো ভবনের কিছু অংশ ভেঙে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও এখনো কিছু এলাকায় পুরনো ও পরিত্যক্ত স্থাপনা রয়েছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব পুরনো ভবন, খালি জায়গা ও দুর্বল সীমানা প্রাচীরের সুযোগ নিয়ে বহিরাগত অপরাধীরা সেখানে অবস্থান নেয়। কিছু এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আড্ডা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এজিবি কলোনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এর চারপাশে মতিঝিলের ব্যাংকপাড়া, রাজারবাগ, গুলিস্তান ও কমলাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে।
তার মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করে এ ধরনের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করা।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বড় পরিত্যক্ত স্থাপনা থাকা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব এলাকায় নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি পুরনো কলোনিগুলো আধুনিক বহুতল ভবনে রূপান্তর করা গেলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, এজিবি ও আজিমপুর কলোনির অনেক ভবনের স্থায়িত্বকাল শেষ হয়ে গেছে। পুরনো ভবন পুনর্নির্মাণের জন্য একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এসব এলাকার পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

