চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের কয়েকটি উপজেলায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী অপরাধী নেটওয়ার্কের সদস্যরা নিয়মিত চাঁদা দাবি করছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বাড়িতে হামলা চালানো হচ্ছে। কোথাও ভাঙচুর, কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ, আবার কোথাও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে সংঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড, সশস্ত্র হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনার সঙ্গে ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত এই পলাতক আসামি বিদেশে অবস্থান করেই চট্টগ্রামের অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা। যদিও একের পর এক আলোচিত হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে, তবু এখন পর্যন্ত পুরো চক্রটিকে ভেঙে দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
চান্দগাঁও, বাকলিয়া, বায়েজিদ, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার অনেক ব্যবসায়ী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রতিদিনই তারা ভয় নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কারণ, চাঁদা না দিলে যে কোনো সময় হামলার শিকার হতে হতে পারেন।
অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যক্তিদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। কোনো কোনো ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটেছে। তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করেন না। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগ করলেও সুরক্ষা মিলবে না, বরং আরও বড় হামলার মুখে পড়তে হতে পারে।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের নেতৃত্বে ৫০ জনেরও বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে। তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিন থেকে চারজন বিশ্বস্ত সহযোগী। বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকায় এই চক্রের শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। চক্রটি বালু ব্যবসা, গার্মেন্টস ঝুট, পরিবহন, ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন খাতকে লক্ষ্য করে চাঁদাবাজি চালায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অপরাধীরা ভার্চুয়াল নম্বর, এনক্রিপ্টেড বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ এবং দুর্গম পাহাড়ি আস্তানা ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান গোপন রাখে। দিনের আলোতেই হামলা চালিয়ে দ্রুত রাউজান ও ফটিকছড়ির দুর্গম এলাকায় সরে যায় তারা। তদন্তকারীদের ধারণা, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদেরও এই চক্রে যুক্ত করা হচ্ছে।
একের পর এক হামলা:
গত রোববার হাটহাজারীর দক্ষিণ পাহাড়তলীতে একটি ১০ তলা নির্মাণাধীন ভবনের মালিকের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় ভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এর আগে ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের চকবাজার-বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে প্রায় ৩০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালায়। অভিযোগ, হামলার আগে প্রতিষ্ঠানটির কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য, এই হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। পরে যশোর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
একই কৌশলে চাঁদাবাজি:
ব্যবসায়ী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বায়েজিদ, নাসিরাবাদ, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি এলাকায় চাঁদাবাজির প্রবণতা বেড়ে যায়। তদন্তে দেখা গেছে, প্রথমে স্থানীয় সদস্যরা সম্ভাব্য টার্গেট সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর ফোনে কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে চাঁদা দাবি করা হয়। কেউ অস্বীকৃতি জানালে তার বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই বাধ্য হয়ে নিয়মিত চাঁদা দিতে হচ্ছে।
বায়েজিদ এলাকার এক নির্মাণাধীন ভবনের মালিক বলেন, সেখানে ভবন নির্মাণ করতে হলে চাঁদা দিতেই হয়। শুধু নগদ টাকা নয়, চক্রের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান থেকেই বালু ও সিমেন্ট কিনতে বাধ্য করা হয়। অনেকে নির্মাণকাজ চালিয়ে নিতে আপস করতেও বাধ্য হচ্ছেন। তার ভাষায়, এসব ঘটনায় পুলিশের কাছে অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই বলে অনেকের বিশ্বাস। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকায় অধিকাংশ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পান না। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, বায়েজিদের শিল্পাঞ্চলে গার্মেন্টস মালিক ও ঝুট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও নিয়মিত মাসিক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
হাটহাজারীর বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, প্রথমে তার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে তিনি অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করলে আবার ফোন করে দাবি বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয়। স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানও একই ধরনের হামলার শিকার হন। অভিযোগ, ১০ কোটি টাকা চাঁদা না দেওয়ায় চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি তার বাসায় সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। হামলার আগে হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশি নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও ওই হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সিসিটিভিতে হামলাকারীদের দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছিল। পরে ব্যবসায়ী ও বড় সাজ্জাদের মধ্যে সমঝোতার কথা শুনেছেন বলে দাবি করেন। তবে এ বিষয়ে পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। অন্যদিকে মুজিবুর রহমান সমঝোতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আপস করলে এসব ঘটনা ঘটত না। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে এখনও উদ্বিগ্ন তিনি।
কারা রয়েছেন এই চক্রে:
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদ একসময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। ২০০০ সালের বহুল আলোচিত চট্টগ্রামের আট খুন মামলারও আসামি ছিলেন তিনি। নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পেলেও পরে উচ্চ আদালতে খালাস পান।
তদন্তকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার সহযোগীরা আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। শুরুতে স্থানীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতেন ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিংমল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধেও হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। পরে স্থানীয় কার্যক্রমের দায়িত্ব নেয় ডেভিড ইমন, মোহাম্মদ রাইহান আলম ও বোরহান উদ্দিন।
ফটিকছড়ির বাসিন্দা ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বাকলিয়ার জোড়া হত্যা এবং পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাও রয়েছে। পুলিশ মনে করছে, তার কাছে ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। অন্যদিকে রাইহান আলমের বিরুদ্ধে রাউজান ও চট্টগ্রামের আটটি হত্যাকাণ্ডসহ মোট ১৬টি মামলা রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভার্চুয়াল নম্বর ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করায় চাঁদাবাজদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বড় সাজ্জাদ ও রাইহান আলম বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের সহযোগীদের অনেকে রাউজান ও ফটিকছড়ির দুর্গম বনাঞ্চলে আত্মগোপনে রয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। চক্রের অনেক সদস্যকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি সশস্ত্র অপরাধীদেরও আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও জানান, এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া কিশোর গ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, অপরাধীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চলছে। কিছুটা সময় দিলে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

