বিদেশে ভালো চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন আর উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীর তরুণ তানভীর হোসাইনকে পাঠানো হয়েছিল কম্বোডিয়ায়। কিন্তু বিমানবন্দরে পা রাখার পরই বদলে যায় তার স্বপ্নের গল্প। একজন বাংলাদেশি তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে যান একটি ভবনের নিচতলায়। সেটি ছিল একটি ক্যাসিনো। সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় ভূগর্ভস্থ একটি স্থানে।
তখনও তানভীর জানতেন না, চাকরির নামে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে একটি অনলাইন প্রতারণা চক্রের কাছে। চীনা নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওই স্ক্যাম সেন্টারে তাকে ব্যবহার করা হয় ডিজিটাল প্রতারণার কাজে। তানভীরের দায়িত্ব ছিল ‘হানি ট্র্যাপ’-এর মাধ্যমে তরুণী পরিচয়ে অনলাইনে সম্পর্ক তৈরি করা। এরপর নানা কৌশলে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই ছিল লক্ষ্য। কিন্তু এই কাজে রাজি না হওয়ায় তার ওপর চালানো হয় নির্যাতন।
মানব পাচারের শিকার তানভীর সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। তবে তার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে অনেক তরুণকে। পরে তাদের আটকে রেখে জোর করে সাইবার অপরাধে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক পাচার চক্র।
প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে মানব পাচারের ধরনও। এখন ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিপফেক প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে তরুণদের টার্গেট করছে অপরাধীরা।
মানব পাচারের ঘটনা বাড়লেও এসব মামলায় সাজা পাওয়ার হার এখনো খুব কম। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে ৩৫২টি মানব পাচার মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি মামলায় ৩৯ জন আসামি সাজা পেয়েছেন। অন্যদিকে ৩৩৭টি মামলায় ১ হাজার ২৫৯ জন আসামি খালাস পেয়েছেন।
এমন বাস্তবতায় আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন করলেই মানব পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, মানব পাচারের পেছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে অর্থ উপার্জন। প্রতারকরা নানা প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে অবৈধ পথে বিদেশে পাঠায়। এসব ঘটনায় মামলা হচ্ছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। তবে সাজা কম হওয়ার অন্যতম কারণ, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা পরে আপস করেন এবং আদালতে সাক্ষ্য দেন না।
৮ বছরে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি মামলা:
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ৮ বছর ৫ মাসে দেশে মানব পাচার সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৬ হাজার ৮২৫টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩০ হাজার ২৯৫ জনকে। এর মধ্যে ১১ হাজার ২৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তথ্য বলছে, এই সময়ে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন ১০ হাজার ৪৪৪ জন। উদ্ধার করা হয়েছে ৭ হাজার ১৯০ জনকে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মানব পাচারের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫০০টি। এসব মামলায় আসামি ২ হাজার ৩৩৪ জন। গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৫১ জন। একই সময়ে বিভিন্ন দেশে পাচারের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ১৩৫ জন। উদ্ধার করা হয়েছে ৮০৭ জনকে।
বিচার শেষ হলেও অধিকাংশ আসামি খালাস:
মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৭৩৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। ওই বছর আদালতে ২৪৫টি মামলার বিচার শেষ হয়। এর মধ্যে ৯টি মামলায় ২৮ জনের সাজা হয়েছে। বাকি ২৩৬ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। তবে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের দাবি, গত বছর ৪২টি মামলায় ৭৬ জন আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ১০৭টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় ১১ জনের সাজা হয়েছে। অন্য ১০১টি মামলার আসামিরা খালাস পেয়েছেন। ৩১ মার্চ পর্যন্ত মানব পাচারের ১ হাজার ৮১৭টি মামলা তদন্তাধীন ছিল। আদালতে বিচারাধীন ছিল ৩ হাজার ২৭৮টি মামলা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এসব মামলায় সারাদেশের কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৪০০ জন।
নতুন আইনে বাড়ছে অপরাধ দমনের সুযোগ:
মানব পাচার ও অভিবাসন প্রত্যাশী চোরাচালান বন্ধে সরকার নতুন আইন করেছে। নতুন আইনে অভিবাসন প্রত্যাশী চোরাচালানকে আলাদা অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, ভুয়া নিয়োগ, স্ক্যামিং এবং কাউকে জোর করে অপরাধে যুক্ত করার বিষয়গুলোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া পাচারের সঙ্গে যুক্ত সম্পদ জব্দ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পাচারের শিকার হয়ে অপরাধে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, সময়ের সঙ্গে মানব পাচারের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। তাই আইনেও পরিবর্তন প্রয়োজন। নতুন আইন কার্যকর হলে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে বলে আশা করা যায়।
‘মিষ্টি কথায়’ ফাঁদে পড়ছে মানুষ:
অভাব দূর করার স্বপ্নে অনেকেই জমি, বসতভিটা কিংবা পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগায় পাচারকারী চক্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থাকা অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মানুষকে আটকে রেখে জোর করে সাইবার প্রতারণায় ব্যবহার করার অভিযোগ বাড়ছে।
এ ছাড়া ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে লিবিয়ার বন্দিশিবিরে আটকে নির্যাতন করা হচ্ছে। পরে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায় করছে চক্রের সদস্যরা।
ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টায় অনেকে প্রাণও হারাচ্ছেন। গত ২৫ মার্চ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের একজন ছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান। তার বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, দালালদের কথায় বিশ্বাস করে ১১ লাখ টাকা দিয়ে ছেলে বিদেশ গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার মরদেহও দেখতে পারেননি তারা। এর আগে ২০২০ সালের ২৮ মে লিবিয়ার মিজদা শহরের একটি বন্দিশিবিরে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় ১২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান।
কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা শেষ করে ২০২৩ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন তানভীর হোসাইন। ২০২৫ সালের শেষ দিকে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আব্দুর রহমান সানি কম্বোডিয়ায় কম্পিউটার বিভাগে ভালো বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেন। সাত লাখ টাকার বিনিময়ে সব ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেন সানি। এরপর গত ১২ ডিসেম্বর কম্বোডিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তানভীর।
তিনি জানান, যে স্ক্যাম সেন্টারে তাকে নেওয়া হয়েছিল সেখানে প্রায় ৫০০ তরুণকে অনলাইন প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ‘ব্ল্যাকসেল’ নামের একটি নির্যাতন কক্ষে নেওয়া হয়। প্রাণ বাঁচাতে পরে তিনি কাজে রাজি হন। এরপর চীনা নাগরিকরা তাকে ‘হানি ট্র্যাপ’ পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেয়।
কাজ শুরুর ১৭ দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) সহায়তায় কম্বোডিয়ার পুলিশ স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে অভিযান শুরু করে। তখন চক্রের সদস্যরা তাদের নিয়ে একটি জঙ্গলে পালিয়ে যায়। প্রায় তিন মাস সেখানে আটকে থাকার পর মুক্তির জন্য তানভীরের বাবার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নেওয়া হয়। এরপর মুক্ত হয়ে গত ২৩ মার্চ দেশে ফেরেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মানব পাচার মামলায় আসামিরা সহজে খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন। তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। পাচারের সঙ্গে যুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

