সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে (ইউজিসি) অনুমোদিত শতাধিক গবেষণা প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো জমা দেওয়া হয়নি চূড়ান্ত প্রতিবেদন। ফলে এসব গবেষণায় বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার, গবেষণার ফলাফল এবং এর বাস্তব অবদান নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ইউজিসির অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মোট ৪৮২টি গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩২৪টি প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়লেও ১৫৮টি প্রকল্পের প্রতিবেদন এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে।
অর্থাৎ অনুমোদিত মোট গবেষণা প্রকল্পের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের চূড়ান্ত হিসাব এখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা হয়নি। এসব প্রকল্পে সরকারি অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
সাধারণত ইউজিসির অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পের মেয়াদ থাকে এক বছর। এই সময়ের মধ্যে গবেষণা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া গবেষকের দায়িত্ব। কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে নিয়ম অনুযায়ী সময় বৃদ্ধির আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে অতিরিক্ত সময় পাওয়ার পরও প্রতিবেদন জমা না দিলে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
গবেষণা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অর্থ বরাদ্দ দিলেই একটি গবেষণা সফল হয় না। গবেষণার ফলাফল কী হয়েছে, নতুন কী জ্ঞান তৈরি হয়েছে, সমাজ বা নীতিনির্ধারণে এর কোনো প্রভাব পড়েছে কিনা—এসব জানতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদন না থাকলে গবেষণার মান যাচাই করা এবং ভবিষ্যতের অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, সরকারি অর্থ নিয়ে গবেষণার প্রতিবেদন জমা না দেওয়া গুরুতর বিষয়। তার মতে, গবেষণার জন্য জনগণের অর্থ ব্যবহার করা হয়, তাই এর যথাযথ হিসাব ও ফলাফল প্রকাশ করা গবেষকের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষক গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পদ-পদবির দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ছেন। এর ফলে গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল একাডেমিক চর্চা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত গবেষণা প্রকল্পের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও পরবর্তী দুই অর্থবছরে অনুদান ও প্রকল্পের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এসব প্রকল্পে সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই অর্থে কী ধরনের গবেষণা হয়েছে, তার ফলাফল কী এবং গবেষণার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হয়েছে—১৫৮টি প্রকল্পের ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা তৈরি হয়েছে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য চাওয়ার পর। গত ১৮ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ পরিচালকের কাছে আবেদন করে গত পাঁচ অর্থবছরে ইউজিসির অর্থায়নে পাওয়া গবেষণা অনুদান, প্রতিবেদন জমা দেওয়া শিক্ষক এবং প্রতিবেদন না দেওয়া শিক্ষকদের তালিকা চাওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও দীর্ঘ সময় কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগের পর জানা যায়, আবেদনটি একাধিক দপ্তর ঘুরে শেষ পর্যন্ত কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে রয়েছে।
পরবর্তীতে অনুমোদন পাওয়া তথ্যে শুধু প্রকল্পের সংখ্যা জানানো হলেও প্রতিবেদন জমা না দেওয়া শিক্ষকদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, যেসব তথ্য প্রকাশের অনুমতি রয়েছে, শুধু সেগুলোই দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের নাম প্রকাশের অনুমোদন না থাকায় তা প্রকাশ করা হয়নি।
পরে বিষয়টি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলামের নজরে আনা হলে তিনি নতুন করে আবেদন করার পরামর্শ দেন। ২২ জুলাই পুনরায় আবেদন করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের তালিকা পাওয়া যায়নি।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, গবেষণা তহবিল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গবেষণা তহবিলের বরাদ্দ, অর্থ ব্যবহার, চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক নথিপত্র যাচাই করবে এই কমিটি।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন, অতীতে অনেক গবেষণা প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও কিছু ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় আর্থিক কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। এসব বিষয় স্বচ্ছভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যেই তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে ইউজিসির রিসার্চ গ্রান্টস অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ড বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ওমর ফারুখ জানিয়েছেন, একটি গবেষণা প্রকল্প সাধারণত এক বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন কারণে অনেক সময় প্রতিবেদন জমা দিতে দেরি হতে পারে। কোনো গবেষক নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করতে ব্যর্থ হলে নিয়ম অনুযায়ী অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়াও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মান উন্নয়ন করতে হলে শুধু নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিলেই হবে না, বরং পুরোনো প্রকল্পগুলোর ফলাফল ও অর্থ ব্যবহারের হিসাব নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি অর্থে পরিচালিত গবেষণায় স্বচ্ছতা না থাকলে ভবিষ্যতে গবেষণা অনুদানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং দেশের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ১৫৮টি অসম্পন্ন প্রতিবেদনের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

