দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, বিশাল ঋণের বোঝা এবং টানা লোকসানের কারণে গভীর সংকটে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ক্রয় প্রক্রিয়া, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে না পারায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে ক্রমাগত।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির কোনো অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন মালামাল ক্রয় করা হয়েছে। চা বাগানের শ্রমিকদের আবাসন সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত টেন্ডার প্রক্রিয়া ও সরকারি ক্রয়নীতি অনুসরণ করা হয়নি। কাগজপত্রে ক্রয়ের তথ্য থাকলেও প্রকৃত পরিদর্শনে তার ঘাটতি ধরা পড়েছে, আর কেন্দ্রীয় গুদামে সংরক্ষিত বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্যের মজুতেও পাওয়া গেছে উল্লেখযোগ্য গরমিল।
২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাবে কোম্পানির মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার সাতশ পঁয়ষট্টি কোটি টাকা, যার মধ্যে ছয়শ চুয়াল্লিশ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নেগেটিভ ইক্যুইটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার একশ আশি কোটি টাকায়। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণে কোনো কার্যকর পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার স্পষ্ট অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি।
২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত শেয়ারধারণ একান্ন শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় কোম্পানিটি এখন আর সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেই। এই সুযোগে অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে গত দুই অর্থবছরে কোম্পানিটি বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন করতে পারেনি এবং একই সময়ে কোনো আর্থিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করতে পারেনি। এই নিয়ম লঙ্ঘনের ব্যাখ্যা চেয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ চিঠি দিলেও কোম্পানির পক্ষ থেকে এখনো কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানির একজন কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
জানা গেছে, কোম্পানির ষোলোটি চা বাগানের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে বারোটি। তবে অধিকাংশ বাগানের বয়স একশ বছরের বেশি হওয়ায় উৎপাদনশীলতা কমেছে এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেছে। চালু থাকা বারোটি বাগানের মধ্যে আটটিই এখন লোকসানে চলছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ অর্থবছর ধরে টানা লোকসানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি—২০২১ সালে লোকসান ছিল প্রায় একুশ কোটি টাকা, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় প্রায় তেইশ কোটি টাকা, আর ২০২৩ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় তেষট্টি কোটি টাকায়। বর্তমানে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে অবস্থান করছে।
শেয়ারদরেও এসেছে বড় ধরনের ধস। দশ টাকা অভিহিত মূল্যের এই শেয়ার ২০২৪ সালের এপ্রিলে চারশ বিশ টাকার বেশি দামে লেনদেন হলেও ২০২৫ সালের এপ্রিলে তা নেমে আসে একশ ষাট টাকায়—অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দর কমেছে প্রায় একষট্টি শতাংশ। বর্তমানে শেয়ারটির বাজারদর একশ আটষট্টি টাকার আশেপাশে।
নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্থায়ী সম্পদের মূল্যায়ন, অবচয় নির্ধারণ ও কৃষিজ সম্পদের হিসাবায়নে প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক হিসাবমান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি, যার ফলে সম্পদের প্রকৃত মূল্য ও উৎপাদন-সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রাইট শেয়ার ইস্যুতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় চাঁদা সংগ্রহ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই এবং পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের রাইট শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত ভঙ্গ করে সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে, অথচ এ বিষয়ে কোনো নিয়মিত প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া হয়নি।
নির্ধারিত সময়ে আর্থিক বিবরণী জমা দিতে না পারায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের জরিমানাও গুনতে হচ্ছে কোম্পানিটিকে, এবং এই জরিমানা মওকুফের আবেদনও করেছে তারা।
তবে কোম্পানির একজন পরিচালক বলেন, একটি সরকারি ব্যাংক থেকে নেওয়া উচ্চ সুদের ঋণের কারণে প্রতিবছর বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। দুই বছর ধরে সমাধানের চেষ্টা চললেও এখনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি, এবং করোনা মহামারির সময়কার ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রভাবও এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার একজন মুখপাত্র জানান, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তারা তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন, পাশাপাশি ন্যূনতম শেয়ারধারণ-সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়নেও কঠোর অবস্থানে থাকবেন তারা।
একটি গবেষণা সংস্থার একজন গবেষক মনে করেন, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, ঋণ পুনর্গঠনে অগ্রগতি এবং পরিচালন মুনাফায় উন্নতির স্পষ্ট প্রমাণ না মেলা পর্যন্ত এই কোম্পানি উচ্চ ঝুঁকিতেই থাকবে, তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা উচিত। তাঁর মতে, সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ক্রমাগত দুর্বল করে দিচ্ছে, আর এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা মূলত নির্ভর করছে ঋণের চাপ কমানো ও নেগেটিভ ইক্যুইটি কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতার ওপর।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোম্পানিটির ছয়জন পরিচালক একযোগে পদত্যাগ করেন, এরপর দীর্ঘদিন কোনো বোর্ড সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে ২০২২ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি—সর্বশেষ ২০২২ সালে শেয়ারহোল্ডারদের সাড়ে সাত শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এর মধ্যেও একটি ইতিবাচক তথ্য উঠে এসেছে—২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একত্রিশতম চা নিলামে কোম্পানির বারোটি বাগানের প্রায় আড়াই লাখ কেজি চা বিক্রি করে ছয় কোটি টাকার বেশি আয় হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে একক নিলামে সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড। তবে দেশের মোট চা উৎপাদনের প্রায় নয় শতাংশ নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ঘাটতি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

