রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষককে টার্গেট করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র। পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফোন করে মামলা ও গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চক্রটির বিরুদ্ধে। এখন পর্যন্ত এক ডজনের বেশি শিক্ষার্থী এবং একজন শিক্ষক এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতারকরা প্রথমে নিজেদের পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর তাঁরা ভুক্তভোগীর সাম্প্রতিক লেনদেনের সময়, স্থান ও পরিমাণসংক্রান্ত এমন সব নির্ভুল তথ্য উপস্থাপন করেন, যা সাধারণত গ্রাহক বা সংশ্লিষ্ট এজেন্ট ছাড়া অন্য কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়—এভাবেই তাঁরা প্রথমে আস্থা অর্জন করে নেন।
আস্থা তৈরি হওয়ার পর জাল টাকা লেনদেনের মামলায় জড়িয়ে পড়ার ভয় দেখিয়ে পুলিশ পাঠানো, গ্রেফতার কিংবা আইনি জটিলতার হুমকি দিয়ে মানসিক চাপ তৈরি করা হয়। এই চাপের মধ্যেই একপর্যায়ে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ডসহ বিভিন্ন কৌশলে হিসাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টাকা সরিয়ে ফেলা হয়।
ভুক্তভোগীদের একজন প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি মিনিবাজারের নির্দিষ্ট এক মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট পয়েন্ট থেকে তিনি লেনদেন করেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে একই কৌশলে প্রথমে তাঁর কাছ থেকে সাত হাজার টাকা নিয়ে নেন। পরবর্তীতে তাঁর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে একই চক্র আরও তিপ্পান্ন হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান প্রথম বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, একই এজেন্ট পয়েন্ট থেকে টাকা তোলার পরদিনই পুলিশ সদর দপ্তরের পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাঁকে ফোন করেন এবং দাবি করেন, ওই দোকান থেকে জাল টাকা নেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি সাধারণ ডায়েরিতে ভুলবশত তাঁর নম্বর যুক্ত হয়ে গেছে। এই অজুহাতে তাঁর অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলে ওটিপি চাওয়া হয় এবং নিজের নম্বরে টাকা স্থানান্তরের কথা বলে মোট বিশ হাজার তিনশ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, একই দোকান থেকে লেনদেন করা আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
দ্বিতীয় বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী জানান, ল্যাপটপ কেনার জন্য পরিবারের পাঠানো তেষট্টি হাজার পাঁচশ টাকা একই ভয়ভীতি দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের একজন শিক্ষকের কাছ থেকেও একই পদ্ধতিতে দেড় লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারণার শিকার হওয়া প্রায় সবাই একই এজেন্ট পয়েন্ট থেকে লেনদেন করেছিলেন, এবং লেনদেনের পরপরই প্রতারকরা লেনদেনের সময়, পরিমাণ ও মাধ্যম হুবহু বলে দিতে পারছিল। এতে তাঁদের সন্দেহ, ওই এজেন্ট পয়েন্টের সঙ্গে প্রতারক চক্রের কোনো যোগসাজশ থাকতে পারে, নয়তো এত সুনির্দিষ্ট গোপন তথ্য প্রতারকদের হাতে পৌঁছানোর কোনো ব্যাখ্যা নেই।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট এজেন্ট পয়েন্টে গেলে দোকান বন্ধ পাওয়া যায় এবং মালিকের সঙ্গে বারবার চেষ্টা করেও ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
প্রতারকদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা দ্রুত চক্রটিকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট থানার একজন উপপরিদর্শক জানান, এই ঘটনায় একটি জিডি হয়েছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে, তবে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং স্থানীয় থানার সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ রেখে তদন্তে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
এ ধরনের প্রতারণা এড়াতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, অপরিচিত নম্বর থেকে আসা কোনো কল বা বার্তায় ওটিপি বা ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য কখনোই শেয়ার না করার, এবং পুলিশ পরিচয়ে ফোন এলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করার।

