দুই দশকের বেশি সময় ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও আইনের পাতায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে এটি বহাল ছিল লেবাননে। এবার সেই অবস্থারও অবসান ঘটল। মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে আইন পাস করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি বিলুপ্ত করার পথে গেল লেবানন।
মঙ্গলবার বেশ কিছু সংশোধনীসহ বিলটিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। ১২৮ সদস্যের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বিলটির পক্ষে ভোট দেন। তবে হিজবুল্লাহ-সমর্থিত সংসদীয় জোট এর বিরোধিতা করেছে।
অধিবেশনে উপস্থিত আইনমন্ত্রী আদেল নাসার সিদ্ধান্তটিকে দেশের জন্য ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। নতুন আইনে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সশ্রম আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
দুই দশক ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি
লেবাননে ২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর অলিখিত স্থগিতাদেশ ছিল। ফলে গত দুই দশকের বেশি সময়ে দেশটিতে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। কিন্তু আদালতগুলো মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া থেকে বিরত থাকেনি।
লেবাননের আইন মন্ত্রণালয়ের কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে ৮৫ জন আসামি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন। অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বিরতি থাকলেও আইনি কাঠামোতে এর অস্তিত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
নতুন আইন সেই দ্বৈত অবস্থার অবসান ঘটাল। একদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার দীর্ঘদিনের বাস্তবতা, অন্যদিকে আদালতের রায়ে এর উপস্থিতি—দুইয়ের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে সেটিই এখন দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন
মৃত্যুদণ্ড বিলোপের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংগঠনটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক হেবা মোরায়েফ এটিকে লেবাননের জন্য একটি বড় মাইলফলক এবং মানবাধিকারের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দশকের বেশি সময় ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার যে অনিশ্চিত বিরতি চলছিল, নতুন আইন সেটিকে স্থায়ী আইনি সুরক্ষায় পরিণত করেছে। একই সঙ্গে জীবনের অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার আরও স্পষ্ট হলো এবং মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গেও লেবানন যুক্ত হলো।
তবে আইন পাস হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যে সশ্রম আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিধান করা হয়েছে, সেটি কীভাবে কার্যকর হবে—তা নিয়ে এখনো বিস্তারিত স্পষ্টতা নেই।
কারাগারের সক্ষমতা নিয়েও বড় প্রশ্ন
লেবাননের কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দিতে ভুগছে। এর সঙ্গে রয়েছে দেশটির দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট। ফলে বিপুলসংখ্যক বন্দিকে দীর্ঘমেয়াদি বা আমৃত্যু কারাদণ্ডে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সহজ হবে না।
কিছু আইনপ্রণেতাও নতুন শাস্তির বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের আইনটি মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পরবর্তী ধাপ হবে কারাগার ব্যবস্থার সংস্কার, দীর্ঘমেয়াদি বন্দিদের ব্যবস্থাপনা এবং নতুন শাস্তির সুস্পষ্ট প্রয়োগবিধি তৈরি করা।
লেবাননের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি শাস্তি বাতিলের ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল থাকা মৃত্যুদণ্ডের বিধানকে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে আইনের বাইরে সরিয়ে দিয়ে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করল। তবে সেই দৃষ্টান্ত কতটা কার্যকর ও টেকসই হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন আইন বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হয় তার ওপর।

