খাসজমিতে মহিষ চরাতে হলে দিতে হবে মাসে ২০০ টাকা। টাকা না দিলে মহিষ চরাতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের লালচরে এমন অভিযোগ উঠেছে সাবেক এক ছাত্রদল নেতা মাঈনউদ্দিনের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় মহিষ খামারিদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে লালচরে মহিষপ্রতি মাসে ২০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ওই খাসজমিতে কোনো খরচ ছাড়াই মহিষ চরিয়ে আসছিলেন স্থানীয় খামারিরা।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লালচরে বর্তমানে প্রায় ৪৭৮টি মহিষ রয়েছে। প্রতিটি মহিষের জন্য মাসে ২০০ টাকা নেওয়া হলে মাসিক আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯৫ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থাৎ বছরে এই হিসাবে আদায়ের পরিমাণ ১১ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা।
প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি খাসজমিতে মহিষ চরানোর বিনিময়ে এই অর্থ আদায়ের অনুমতি কে দিয়েছে? সরকারি জমি ব্যবহারের এমন কোনো ইজারা বা বৈধ বন্দোবস্ত হয়ে থাকলে তার নথি কোথায়?
স্থানীয় মহিষ পালনকারীদের ভাষ্য, আগে বিনা খরচেই তাঁরা সেখানে মহিষ চরাতেন। এখন নিয়মিত টাকা দিতে হচ্ছে। ফলে নদী ও চরাঞ্চলের প্রান্তিক খামারিদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
মহিষ পালনকারী রেজাউল খান ও ইদ্রিস দালাল বলেন, নিয়মিত টাকা দিতে হলে তাঁদের মতো প্রান্তিক চাষিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। আলমগীর হাওলাদার বলেন, বহু বছর ধরে কোনো খরচ ছাড়াই মহিষ চরিয়ে সংসার চালিয়েছেন তাঁরা। ৫ আগস্টের পর নির্ধারিত টাকা তাঁদের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের দাবি, কোনো বাধা বা খরচ ছাড়াই মহিষ চরানোর সুযোগ দিতে হবে।
সাইফুল শরীফের অভিযোগ, টাকা না দিলে মহিষ রাখতে দেওয়া হয় না। এমনকি ভয়ভীতিও দেখানো হয়। সোহাগ হাওলাদার এভাবে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
গৃহবধূ রাজিয়া বেগম বলেন, মহিষ পালন করেই তাঁদের সংসার চলে। এর মধ্যে নিয়মিত টাকা দিতে গিয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি এ ঘটনার বিচার চান। রোজিনা আক্তারের অভিযোগ, মাঈনউদ্দিন ও তাঁর লোকজন জোরপূর্বক টাকা নিচ্ছেন। প্রশাসনের কাছে অর্থ আদায় বন্ধের দাবি জানান তিনি।
খাসজমি ‘ইজারা’ দিল কে?
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই। লালচর যে খাসজমি, সেখানে মহিষ চরানোর জন্য স্থানীয় একজন ব্যক্তি কীভাবে মহিষপ্রতি মাসে ২০০ টাকা নির্ধারণ ও আদায় করছেন—তার বৈধ ভিত্তি কী? সেটি স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
কারণ কোনো সরকারি খাসজমি ব্যবহার বা ইজারা দেওয়ার নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থাকার কথা। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যদি কাউকে বৈধভাবে জমি ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি, ইজারার শর্ত এবং অর্থের হিসাব প্রকাশ করা উচিত। আর যদি এমন কোনো অনুমোদন না থাকে, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে সরকারি জমি ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ আদায়ের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো—সেটিও প্রশাসনের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগের মুখে মাঈনউদ্দিন অবশ্য এটিকে চাঁদাবাজি বলতে নারাজ। তাঁর দাবি, মহিষের কারণে দরিদ্র জেলেদের মাছ ধরার চাই ও জাল নষ্ট হচ্ছিল। এ নিয়ে সালিশে মহিষপ্রতি ২০০ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়। ওই অর্থ সাময়িকভাবে তাঁর কাছে রাখা হয়েছে। ঝামেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে টাকা বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে শিগগিরই তা দেওয়া হবে বলে দাবি করেন তিনি।
বাউফল উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিয়াজ খানও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, কেশবপুর ও চন্দ্রদ্বীপের মধ্যবর্তী খাসজমিতে মহিষের পায়ের নিচে পড়ে লক্ষাধিক টাকার জাল ও চাই নষ্ট হয়েছে। স্থানীয় মহিলা ইউপি সদস্যসহ উভয়পক্ষের সম্মতিতে মহিষমালিকদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে মোট ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। ওই অর্থ মহিলা ইউপি সদস্য ছাত্রদলের ওই কর্মীর কাছে জমা রেখেছেন।
তবে এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের সিদ্ধান্ত যদি স্থানীয় সালিশে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ২০০ টাকা কি প্রতি মহিষের জন্য প্রতি মাসে, নাকি এককালীন জরিমানা?
স্থানীয়দের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের এই পার্থক্যও পরিষ্কার হওয়া দরকার। একই সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা আদায়ের দাবি করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগে প্রায় ৪৭৮টি মহিষের কথা বলা হচ্ছে। ফলে মোট কত টাকা নেওয়া হয়েছে, কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, সেই অর্থ কোথায় রাখা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কত টাকা দেওয়া হয়েছে—এসবের স্বচ্ছ হিসাবও প্রয়োজন।
নিয়াজ খান অভিযোগ করেছেন, একটি রাজনৈতিক চক্র ও স্থানীয় একটি মহল বিএনপি ও ছাত্রদলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চাঁদাবাজির মিথ্যা নাটক সাজিয়েছে। ফলে অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা, সেটি রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করাই যুক্তিসংগত।
প্রশাসনের দায়িত্ব কোথায়?
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, থানায় লিখিত অভিযোগ আসেনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু বিষয়টি কেবল থানায় লিখিত অভিযোগ হয়েছে কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু সরকারি খাসজমি এবং সেখানে অর্থ আদায়ের প্রশ্ন, তাই ভূমি প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনেরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি জমিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিয়মিত অর্থ আদায় করলে তার বৈধতা যাচাই করা প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
প্রশাসনের উচিত সরেজমিনে গিয়ে লালচরের জমির মালিকানা ও শ্রেণি যাচাই করা, কোনো ইজারা বা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে কি না তা নথিপত্রে দেখা, মহিষের সংখ্যা ও অর্থ আদায়ের প্রকৃত হিসাব বের করা এবং জাল-চাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ থাকলে তারও তদন্ত করা। সালিশের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হয়ে থাকলে সেই সালিশের সিদ্ধান্ত, অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি এবং অর্থের হিসাবও যাচাই করা দরকার।
কারণ ২০০ টাকা অঙ্কটি ছোট মনে হলেও ৪৭৮টি মহিষের হিসাবে তা মাসে প্রায় ৯৫ হাজার ৬০০ টাকা। বছরে সেই অঙ্ক ১১ লাখ টাকার বেশি। কোনো বৈধ সরকারি প্রক্রিয়া ছাড়া এভাবে বিপুল অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হলে তা শুধু কয়েকজন মহিষ পালনকারীর ওপর বাড়তি চাপ নয়—সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
অন্যদিকে মহিষের কারণে জেলেদের জাল ও চাই নষ্ট হওয়ার অভিযোগ সত্য হলে সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মহিষ পালনকারী ও জেলেদের মধ্যে বিরোধের স্থায়ী সমাধান করা দরকার। ক্ষতিপূরণের নামে নিয়মিত অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা চালু হয়ে গেলে সেটি আর সালিশের সাময়িক সিদ্ধান্ত থাকে না; তখন তা এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক আদায় ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই এখানে সবচেয়ে জরুরি। সরকারি খাসজমি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সেখানে মহিষ চরানোর অধিকার কিংবা তার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা থাকলে তার আইনি ভিত্তি স্পষ্ট থাকতে হবে। আর সেই ভিত্তি না থাকলে প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে অর্থ আদায় বন্ধ করা।
প্রান্তিক মহিষ খামারিরা যেন রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা স্থানীয় কোনো গোষ্ঠীর চাপের কাছে জিম্মি না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বৈধ ও স্বচ্ছ পথ বের করতে হবে।
লালচরের ঘটনা তাই শুধু মহিষপ্রতি ২০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ নয়। এটি সরকারি খাসজমির ব্যবহার, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কর্তৃত্ব, সালিশের নামে অর্থ আদায় এবং প্রশাসনের নজরদারি—সবকিছুকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন বিষয়টিকে নিছক স্থানীয় বিরোধ হিসেবে দেখবে, নাকি সরকারি সম্পদ ও প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

