কেএএম মাজেদুর রহমান এখন মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। কিন্তু বাংলাদেশে তাঁর সাবেক কর্মস্থল প্রিমিয়ার ব্যাংককে ঘিরে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধানে তাঁর নাম এসেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালসহ ২০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকাতেও ছিল মাজেদুর রহমানের নাম।
মাজেদুর রহমানের বর্তমান অবস্থান অবশ্যই আগে পরিষ্কার করা দরকার। তিনি ২০২২ সালের অক্টোবরে মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ব্যাংকটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও তাঁকে চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র অনির্বাহী পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২৬ সালেও ব্যাংকের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশে তাঁর ব্যাংকিং ক্যারিয়ার থেমে নেই; বরং তিনি এখনো মালদ্বীপের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে তাঁর নাম এসেছে একেবারেই ভিন্ন কারণে। মাজেদুর রহমান ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। পরে তিনি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ফলে দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে তাঁর দীর্ঘ পেশাগত পরিচিতি রয়েছে।
প্রিমিয়ার ব্যাংককে ঘিরে দুদকের অনুসন্ধানটি বড় পরিসরের। আদালতে দেওয়া দুদকের আবেদনে সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল, তাঁর পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার, অফিস ভাড়া বাবদ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে ৪ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা এবং অতিরিক্ত স্টেশনারি ব্যয় দেখিয়ে ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তবে এগুলো দুদকের অনুসন্ধানে উত্থাপিত অভিযোগ; আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ নয়।
এই বড় অনুসন্ধানের মধ্যেই মাজেদুর রহমানের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর দুদকের আবেদনের পর ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত প্রিমিয়ার ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ২০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন। তালিকায় মাজেদুর রহমান ছাড়াও ব্যাংকের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরিচালকের নাম ছিল। দুদক আদালতকে জানিয়েছিল, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিদেশে চলে গেলে অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে মাজেদুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যালেন্ডার ও টেলিভিশন বিজ্ঞাপনসহ যেসব অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরও দাবি করেছেন, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ‘বোর্ডের সদস্য সচিব’ হিসেবে তাঁকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও সঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য, দুদকের যে প্রতিবেদনের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং দুদক এখনো তাঁর বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত শেষ করেনি।
মাজেদুর রহমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি তাই শুধু একজন সাবেক ব্যাংকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের গল্প নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জবাবদিহি এবং বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন, দুই বাস্তবতা একই সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একদিকে তিনি মালদ্বীপের একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশে তাঁর সাবেক কর্মস্থলকে ঘিরে বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অনুসন্ধানে তাঁর নাম রয়েছে। মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের প্রকাশ্য নথিতে তাঁকে চেয়ারম্যান হিসেবে বহাল থাকার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অভিযোগের শেষ পরিণতি কী হয়। কারণ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, পরিচালনার সময় কার কী ভূমিকা ছিল, কোন সিদ্ধান্ত কে অনুমোদন করেছেন এবং সেই সিদ্ধান্তে কার আর্থিক সুবিধা হয়েছে, এসব প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হয়। মাজেদুর রহমানের ক্ষেত্রেও সেটিই এখন মূল বিষয়। অভিযোগ থাকলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না; আবার কোনো সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার নাম অনুসন্ধানে এলে তাঁর ভূমিকা যাচাই না করেও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

