সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এমটি রাসি কাটার কাজ চলছিল এমন সময়, যখন ইয়ার্ডটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এর দুই দিন পরই জাহাজটির ব্যালাস্ট ট্যাংকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি থাকলেই কি একটি ইয়ার্ড নিরাপদ হয়ে যায়?
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফেরদৌস স্টিলকে সর্বশেষ পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট। ৩১টি শর্তযুক্ত ওই ছাড়পত্রের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত। অথচ এমটি রাসি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইয়ার্ডে আনার পর কয়েক মাস ধরে জাহাজটি কাটার কাজ চলছিল এবং দুর্ঘটনার সময়ও কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। অর্থাৎ, ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম চলার অভিযোগটি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশগত ছাড়পত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুমতি নয়। জাহাজের ভেতরে থাকা তেল, রাসায়নিক, ভারী ধাতু, গ্যাসসহ বিপজ্জনক পদার্থ ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য কীভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হবে এসব বিষয়ও পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিকভাবে হংকং কনভেনশনও জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং নজরদারির মতো বিষয়কে বাধ্যতামূলক কাঠামোর মধ্যে এনেছে। কনভেনশনটি ২০২৫ সালের ২৬ জুন কার্যকর হয়েছে।
বাংলাদেশেও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া শিল্পকারখানার কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরই এই ছাড়পত্র দেয় এবং পরিবেশগত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী শর্ত নির্ধারণ করে। ফলে একটি ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক ‘গ্রিন’ সনদ পেলেও তার জাতীয় পরিবেশগত অনুমোদনের মেয়াদ আলাদা বিষয়। একটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অন্য সনদ সেটির বিকল্প হয়ে যায় না।
এখানেই ফেরদৌস স্টিলের ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অধীনে অনুমোদিত হলেও তার দৈনন্দিন কার্যক্রমের জন্য জাতীয় পর্যায়ের অনুমোদন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি সবগুলোই কার্যকর থাকতে হয়।
এমটি রাসি ছিল সাবেক এলএনজি ক্যারিয়ার। জাহাজটি ২০২৫ সালের ৫ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় আসে এবং ১৩ জুলাই ভাঙার জন্য তীরে তোলা হয়। দুর্ঘটনার সময় একটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের অংশ কাটার কাজ চলছিল। ব্যালাস্ট ট্যাংকে সাধারণত জাহাজের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি রাখা হয়।
কিন্তু ‘পানি আছে’ মানেই ট্যাংকটি নিরাপদ এমন ধারণাই এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে। দুর্ঘটনার পর পরিদর্শনে ট্যাংকের ভেতরে অতিরিক্ত মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। হাইড্রোজেন সালফাইড অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস এবং আবদ্ধ জায়গায় এর উপস্থিতি বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করে।
তাই তদন্তে এখন শুধু গ্যাসটি কোথা থেকে এলো, সেটি জানলেই হবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ট্যাংকে শ্রমিক ঢোকার আগে গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, পরীক্ষার ফল নথিভুক্ত হয়েছিল কি না, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল কি না এবং ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর কাজ বন্ধ করার নিয়ম কার্যকর ছিল কি না।
হংকং কনভেনশনের কাঠামোতেও ইয়ার্ডকে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ, জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি এবং নির্দিষ্ট জাহাজের জন্য রিসাইক্লিং পরিকল্পনা রাখার কথা বলা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ কোনো দুর্ঘটনামুক্ত ইয়ার্ডের সনদ নয়। হংকং কনভেনশনের উদ্দেশ্য হলো জাহাজ রিসাইক্লিংকে নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত করার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এর মধ্যে ইয়ার্ডের অনুমোদন, পরিদর্শন, সনদ, রিপোর্টিং, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং জরুরি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশে এই রূপান্তরের পরও দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের জাহাজভাঙা খাতে অন্তত ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত এবং ২৫ জন আহত হন। গত বছরের একই সময়ে দুর্ঘটনা ছিল ১৫টি, মৃত্যু একজন এবং আহত ১৬ জন।
অর্থাৎ, কাগজে নিয়ম বাড়ছে, ইয়ার্ডে অবকাঠামো উন্নত হচ্ছে—কিন্তু মাঠের নিরাপত্তা ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত আসল পরীক্ষা। একটি গ্যাস ডিটেক্টর থাকলেই হবে না; সেটি কখন ব্যবহার করা হয়েছে, কে ফলাফল যাচাই করেছেন এবং ঝুঁকি পাওয়া গেলে কাজ বন্ধ করা হয়েছে কি না সেখানেই নিরাপত্তার বাস্তবতা।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। দুর্ঘটনার কারণ, কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল কি না এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডও দুর্ঘটনার পর ফেরদৌস স্টিলের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
এর পাশাপাশি পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ চালানোর অভিযোগটি আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্ঘটনার তদন্ত যদি শুধু ‘গ্যাস কীভাবে তৈরি হলো’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে একটি বড় বিষয় বাদ পড়ে যাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন একটি জাহাজ কাটার কাজ চলল?
ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এত বড় জাহাজ আগে না কাটায় এবার কাজ শেষ করতে বেশি সময় লেগেছে এবং ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি তারা খেয়াল করেনি। কিন্তু শিল্পকারখানায় অনুমোদনের মেয়াদ দেখা মালিক বা ব্যবস্থাপনার মৌলিক দায়িত্বের অংশ। ‘খেয়াল করিনি’ এটি তদন্তে দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বাংলাদেশের জন্য জাহাজ রিসাইক্লিং শুধু একটি শিল্প নয়; এটি দেশের ইস্পাত খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের উৎস এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। তাই এই শিল্পকে বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা অর্থনৈতিকভাবেও জরুরি।
হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আইএমও বলছে, কনভেনশনের অধীনে ইয়ার্ডকে অনুমোদিত হতে হবে এবং প্রতিটি জাহাজের জন্য নির্দিষ্ট রিসাইক্লিং পরিকল্পনা, শ্রমিক নিরাপত্তা, জরুরি প্রস্তুতি, পরিবেশ সুরক্ষা ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটি আরও সহজ। শ্রমিক জাহাজের ভেতরে ঢোকার আগে তিনি জানেন কি না যে সেখানে প্রাণঘাতী গ্যাস আছে এটাই নিরাপত্তার প্রথম পরীক্ষা। ইয়ার্ডের দেয়ালে ‘গ্রিন’ সনদ ঝুলছে কি না, সেটি দ্বিতীয় বিষয়।
ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় তাই তদন্তের ফল শুধু নয় শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি দেখাবে, বাংলাদেশে ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ ধারণাটি কাগজ, সনদ ও অবকাঠামোর মধ্যে আটকে আছে, নাকি প্রতিদিনের কাজের জায়গাতেও তার বাস্তব প্রয়োগ হচ্ছে। কারণ একটি ইয়ার্ডের সবুজ হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ কোনো সনদ নয় দিন শেষে শ্রমিকটি সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরছেন কি না।

