বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর কথা যখন নীতিতে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, তখন আমদানির পর্যায়ে কর সুবিধা পেতে ব্যবসায়ীদের যদি কাস্টমসের সঙ্গে ব্যাখ্যা নিয়ে লড়তে হয়, সেটি পুরো উদ্যোগের গতি কমিয়ে দিতে পারে। এই জটিলতা কাটাতে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে প্রযোজ্য শুল্ক-কর ও কাস্টমস প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য এতদিনের একটি বড় অনিশ্চয়তা কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ১১ জুন ২০২৬ জারি হওয়া এসআরও ১৫৯-আইন/২০২৬/১৪/কাস্টমসের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট আমদানির জন্য নতুন কাঠামো করা হয়। এনবিআরের কাস্টমস এসআরও তালিকাতেও এটিকে ‘সোলার এনার্জি প্রোডাকশন রিলেটেড’ নতুন এসআরও হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কিন্তু কাগজে সুবিধা থাকা আর বন্দরে সেটি বাস্তবে পাওয়া দুটি বিষয় সবসময় এক নয়। বিশেষ করে একই ধরনের সৌর পণ্যের ক্ষেত্রে একাধিক প্রজ্ঞাপনের উল্লেখ এবং পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে অস্পষ্টতা আমদানিকারক ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। এর আগে জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিল্প খাতের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, বাজেটের ঘোষিত সুবিধা আর বন্দরে বাস্তবে আদায় হওয়া শুল্কের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছিল।
এখন এনবিআরের ব্যাখ্যার মূল উদ্দেশ্য হলো কোন পণ্যের ক্ষেত্রে কোন প্রজ্ঞাপন ও কোন কাস্টমস প্রসিডিউর কোড ব্যবহার হবে, সেটি মাঠপর্যায়ের কাস্টমস অফিসগুলোকে পরিষ্কার করে দেওয়া। অর্থাৎ ব্যবসায়ীর জন্য বিষয়টি শুধু ‘কর কমল কি না’ নয়; বরং বন্দরে পণ্য খালাসের সময় কোন নিয়ম অনুসরণ করা হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সৌর প্যানেল, ফোটোভোলটাইক মডিউল, ইনভার্টারসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে কর সুবিধা থাকলেও সব ধরনের আমদানিকারকের জন্য একই কর কাঠামো প্রযোজ্য এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। পণ্যটি কে আমদানি করছে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে এবং সংশ্লিষ্ট এসআরওর শর্ত পূরণ করছে কি না এসবের ওপর সুবিধা নির্ভর করবে।
এনবিআরের নতুন নির্দেশনায় সৌর প্যানেলের এইচএস কোড ৮৫৪১.৪৩.০০ নিয়ে আগের বিভ্রান্তিও পরিষ্কার করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, এই কোডের সৌর প্যানেল নির্দিষ্ট ২০২৫ সালের প্রজ্ঞাপনের আওতায় ছাড় করার কথা বলা হয়েছে, আর অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পণ্যের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের সৌরবিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট এসআরও অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে সৌর ইনভার্টারের কোড নিয়ে ২০২৬ সালের প্রজ্ঞাপনে থাকা একটি কারিগরি ভুলও চিহ্নিত করা হয়েছে সঠিক কোড ৮৫০৪.৪০.৯০। পণ্যের বর্ণনায় ‘সোলার ইনভার্টার’ থাকলে শুধু ওই কোডের ভুলের কারণে যোগ্য আমদানিকারককে সুবিধা থেকে বঞ্চিত না করার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
তবে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে এখনও একটি বাস্তব করভার থাকছে। প্রদত্ত কাঠামো অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে তাদের ১ শতাংশ কাস্টমস ডিউটির পাশাপাশি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অ্যাডভান্স ট্যাক্স এবং ৫ শতাংশ অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স দিতে হতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভ্যাট আইনের বর্তমান কাঠামোতেও আমদানির পর্যায়ে অ্যাডভান্স ট্যাক্সের সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে; ২০২৫ সালের পরিবর্তনের পর সাধারণ ক্ষেত্রে এর হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
অর্থাৎ ‘কর সুবিধা’ মানেই সব কর শূন্য হয়ে যাচ্ছে এমনটা বলা ঠিক হবে না। বরং কোন করটি আমদানির সময় দিতে হবে, কোনটি অব্যাহতি পাবে এবং কোনটি পরবর্তী সময়ে সমন্বয়যোগ্য এই পার্থক্যটাই ব্যবসার প্রকৃত খরচ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ এখানেই। বাংলাদেশে আমদানির ক্ষেত্রে সাধারণ ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ এবং করযোগ্য আমদানির মূল্য নির্ধারণে কাস্টমস ডিউটি ও অন্যান্য প্রযোজ্য শুল্কও বিবেচনায় আসে। ফলে সৌর সরঞ্জামের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি কমলেও ভ্যাট ও অন্যান্য করের প্রভাব পুরো প্রকল্পের খরচকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়ীরা শুধু শুল্ক কমানোর মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে মোট করভার বা ‘টোটাল ট্যাক্স ইনসিডেন্স’ কমানোর দাবি করে আসছেন। জুলাইয়ের শিল্পখাতের বিশ্লেষণেও দেখা যায়, সৌর ইনভার্টার ও প্যানেলের ক্ষেত্রে ঘোষিত সুবিধা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে কাস্টমসের মূল্যায়ন পদ্ধতি যদি আমদানিকারকের প্রকৃত লেনদেনমূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য ধরে নেয়, তাহলে কাগজে শুল্ক কম থাকলেও শেষ পর্যন্ত আমদানির খরচ বেড়ে যেতে পারে।
এখানে একটা সহজ হিসাব বোঝা দরকার। সৌর প্যানেল বা ইনভার্টারের দাম শুধু পণ্যের ক্রয়মূল্য নয়; এর সঙ্গে পরিবহন, বন্দর খরচ, শুল্ক-কর, অর্থায়নের খরচ এবং ইনস্টলেশনের ব্যয় যুক্ত হয়। ফলে আমদানির পর্যায়ে সামান্য কর বাড়লেও পুরো সৌর প্রকল্পের মূলধনি ব্যয় বাড়ে। আর প্রকল্পের খরচ যত বাড়বে, বিনিয়োগকারী তার টাকা ফেরত পেতে তত বেশি সময় নেবেন।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু আমদানিকারকদের সুবিধা দেওয়ার প্রশ্ন নয়। সরকার সৌরবিদ্যুৎকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে দেখছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্যও সামনে এসেছে। ফলে এই লক্ষ্য অর্জনে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামের সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া জরুরি।
এখন এনবিআরের নির্দেশনার সবচেয়ে বড় লাভ হতে পারে ‘অনিশ্চয়তার খরচ’ কমানো। একজন আমদানিকারক যদি আগে থেকেই জানেন কোন এইচএস কোডে পণ্য ছাড় হবে, কোন এসআরও প্রযোজ্য এবং কী পরিমাণ শুল্ক-কর দিতে হবে, তাহলে বন্দরে পণ্য আটকে থাকার ঝুঁকি কমে। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়। বিশেষ করে সৌর সরঞ্জামের মতো মূলধনি পণ্যে কয়েক সপ্তাহের বিলম্বও প্রকল্পের অর্থায়ন, ইনস্টলেশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এখানেই সরকারের জন্য পরবর্তী পরীক্ষাটাও আছে। কাগজে নিয়ম স্পষ্ট করার পর মাঠপর্যায়ে তার একই ব্যাখ্যা কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নীতির সুবিধা তখনই বাস্তব সুবিধায় পরিণত হবে, যখন আমদানিকারক বন্দরে গিয়ে একই নিয়মে দ্রুত পণ্য ছাড় করতে পারবেন। পাশাপাশি ভ্যাট, অ্যাডভান্স ট্যাক্স, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স এবং কাস্টমস মূল্যায়ন সব মিলিয়ে প্রকৃত করভারও যদি সৌর প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যায়, তবেই এই নীতির প্রভাব বাজারে দেখা যাবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই শুধু ‘সোলার প্যানেলে শুল্ক কত’ এখানে থেমে থাকে না। প্রশ্ন হলো, একজন উদ্যোক্তা আজ একটি সৌর প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে তার খরচ কত হবে এবং সেই বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে কত বছর লাগবে। এনবিআরের নতুন ব্যাখ্যা প্রথম বাধাটি কিছুটা সরিয়েছে; এখন বাকি কাজ হলো পুরো কর ও কাস্টমস কাঠামোকে এমন পর্যায়ে নেওয়া, যাতে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ শুধু নীতির কাগজে নয়, বাস্তব ব্যবসায়িক হিসাবেও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

