জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহীতে দুই ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং চারজনকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজশাহী মহানগরের কয়েকটি এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় রায়হান আলী ও আনজুম সাকিব নিহত হন। এর মধ্যে বোয়ালিয়া থানার শেখেরচক এলাকার স্বচ্ছ টাওয়ারের বিপরীতে লবঙ্গ রেস্টুরেন্টের সামনে রায়হান আলীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সময়ে শাহ মখদুম কলেজের সামনে আনজুম সাকিব নিহত হন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সালমান ওরফে শিমুলসহ আরও অনেকে আহত হওয়ার কথাও প্রসিকিউশন জানিয়েছে।
শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়। মামলার অভিযোগের পক্ষে তিনটি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ভিডিওতে কয়েকজনকে অস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখা যায় এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে শনাক্তও করা হয়েছে। এসব উপাদানের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য ভিত্তি বা ‘প্রাইমা ফেসি গ্রাউন্ড’ রয়েছে এমন যুক্তিতে অভিযোগ আমলে নেওয়ার আবেদন করা হয়।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেওয়া মানে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। বিচারপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপেই অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং আসামিপক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা হবে। তাই মামলায় যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে এখনো অভিযোগ হিসেবেই দেখতে হবে।
প্রসিকিউশনের আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সিদ্ধান্ত দেন। একই মামলায় চারজন ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার থাকায় তাঁদের আদালতে হাজির করার জন্য ‘প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট’ জারি করা হয়েছে। এই চারজন হলেন রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আসাদুজ্জামান আসাদ, ডাবলু সরকার, জহিরুল ইসলাম রুবেল ও মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাওয়া ৩৪ জনের মধ্যে সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন ছাড়াও রাজশাহীর আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে বিপ্লব বিজয় তালুকদার, হুমায়ুন কবির, রকি কুমার ঘোষ, রাশিক দত্ত, বাপ্পী চৌধুরী রনি, মহিদুল ইসলাম মোস্তফা, খালিদ হাসান বিপ্লব, রাশেদুল করিম রোজেল, জেডু সরকার, আব্দুল হামিদ সরকার, আনোয়ার হোসেন আনার, আরমান আলী, আব্দুল মোমিন, শাহাদত হোসেন শাহু, তৌহিদুল হক সুমন, মাহতাব হোসেন চৌধুরী, আলাউদ্দিন, সরিফুল ইসলাম বাবু, নাবিল হাসান, মাহমুদুল হাসান রাজীবসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে রায়হান আলী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লিটন, ডাবলু সরকারসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীদের একটি মিছিলে গুলি, ককটেল ও বিস্ফোরক নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে এবং পরে রায়হান আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
৩০ জুলাই ২০২৬ প্রসিকিউশন ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছিল। মঙ্গলবার সেই অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল আমলে নেওয়ায় মামলাটি এখন আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়ার আরও একটি ধাপে প্রবেশ করল। পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিষয়ে পরবর্তী শুনানি এবং মামলার প্রমাণ উপস্থাপন এসব ধাপ সামনে আসবে।
মামলাটির গুরুত্ব শুধু আসামিদের পরিচয়ের কারণে নয়; ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার দায় নির্ধারণের বৃহত্তর বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও এটি যুক্ত। ফলে রাজশাহীতে ওই সময়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে কার কী ভূমিকা ছিল, কোন প্রমাণ আদালতে টিকে থাকে এবং অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত কীভাবে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ১৭ সেপ্টেম্বরের পরবর্তী শুনানিতে মামলার অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা। তবে তার আগে পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থান, তাঁদের গ্রেপ্তার এবং আদালতে হাজির করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর আইনগত ভিত্তি কতটা শক্ত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দায় সম্পর্কে আদালতের সিদ্ধান্ত কী হয়।

