বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকেই বন্ধ ছিল সব ফোন। বোনের ফোন, জামাইবাবুর ফোন, ভাগনির ফোন, কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। শনিবার রাতে আর থাকতে না পেরে বোন পূজা চক্রবর্তী ছুটে আসেন রংপুরের মাছুয়াপাড়ায়। সামনে তিনতলা বাড়ি, কিন্তু দরজা ছিল তালাবন্ধ। খোলা হলো দরজা। ভেতর থেকে ভেসে এলো পঁচা গন্ধ। আর তারপরই একে একে উদ্ধার করা হলো চারটি লাশ।
মৃত চারজন হলেন, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৮) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১৪)। পরিবারের সবার সঙ্গেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল বৃহস্পতিবার রাত থেকেই। শনিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে এলাকাবাসী ও পুলিশ লাশগুলোর সন্ধান পায়।
গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া গেছে ছাদের এক প্রান্তে। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তৃতীয় তলার সিঁড়ি থেকে। আর ছোট ছেলে আয়ুশের লাশ পাওয়া গেছে দ্বিতীয় তলার বিছানার নিচে। ঘরের ভেতর জিনিসপত্র ছিল এলোমেলো, কাপড়-গয়নার বাক্স পড়ে ছিল মেঝেতে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের জানিয়েছেন, ধারণা করা হচ্ছে দু-তিন দিন আগে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। রংপুর সিআইডির ইনচার্জ সুমিত চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে রাত ১টায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপাতত আমরা যা দেখলাম, তাতে মনে হচ্ছে ডাকাতির ঘটনা। বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। টাকাপয়সা যেখানে থাকে, সবকিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে। গলায় রশি কিংবা গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে’।
পরিবারের সঙ্গে স্বজনদের শেষ কথা হয়েছিল বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে। ওইদিন আগামী ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। শনিবার রাতে পূজা চক্রবর্তী বোন প্রীতিলতার ফোনে ফোন দেন, কিন্তু তা বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর একে একে গণপতি, আগামী এবং আয়ুশের ফোনেও একই অবস্থা। তখন তিনি স্বামীকে নিয়ে বোনের বাড়িতে ছুটে যান। তালাবদ্ধ দরজা দেখে পুলিশ ডাকা হয়।
গণপতি চক্রবর্তী মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর স্ত্রী শেফালী চক্রবর্তী ঘটনাস্থলে ছুটে এসে বলেছেন, তাদের গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুরে। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন আয়ুশ। এদিকে রংপুর সিআইডি ও মহানগর পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে। লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবার। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে বাড়িটি ছিল তালাবদ্ধ। বাড়ি থেকে পচা গন্ধ আসায় স্থানীয়রা সন্দেহ করেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি ডাকাতি নাকি পরিকল্পিত হত্যা, তা ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
শিক্ষক ও তাঁর পরিবারের এই মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। ছাদ থেকে বিছানার নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চারটি লাশের ঘটনা এখনও রহস্যঘেরা। কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

