সহজ শর্তে ঋণ, কম সুদে বড় অঙ্কের টাকা কিংবা অল্প বিনিয়োগে দ্রুত লাভ—অনলাইনে এমন আকর্ষণীয় প্রস্তাব এখন অনেকের কাছেই পৌঁছে যাচ্ছে। ফেসবুক পেজ, মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট, ফোনকল ও খুদে বার্তার মাধ্যমে দেওয়া এসব প্রস্তাবের আড়ালে রয়েছে প্রতারণার বড় নেটওয়ার্ক। বিশেষ করে আর্থিক সংকটে থাকা মানুষকে লক্ষ্য করে প্রথমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে শুরু হচ্ছে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল। সম্প্রতি ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার বক্তব্যে অনলাইন ঋণ প্রতারণার এমন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতারকেরা সাধারণত খুব সহজ একটি কৌশল ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, যেখানে অল্প সুদে ৫০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রতিশ্রুতি থাকে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সামান্য ফি দেওয়ার পরই ঋণ পাওয়া যাবে—এমন আশ্বাস দেওয়া হয়।
আর্থিক সংকটে থাকা মানুষের কাছে এ ধরনের প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু আবেদন করার পর শুরু হয় নতুন নতুন অর্থ দাবির পালা। কখনো আবেদন ফি, কখনো কাগজপত্রের খরচ, আবার কখনো জামানতের নামে বড় অঙ্কের টাকা চাওয়া হয়। টাকা পাঠানোর পর অনেক ক্ষেত্রেই যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় প্রতারকেরা।
এক ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকা ঋণের আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ৪৫০ টাকা এবং পরে এক লাখ টাকা জামানত চাওয়া হয়। তিনি জামানতের টাকা পাঠানোর পরই সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজ থেকে আর কোনো সাড়া পাননি।
অনলাইন প্রতারণার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো ভুয়া ঋণ অ্যাপ। এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীর কাছ থেকে নানা ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য ও মোবাইলের অনুমতি নিতে পারে। ফলে ফোনবুকে থাকা নম্বর, ছবি বা অন্যান্য তথ্য প্রতারকদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এরপর অতিরিক্ত সুদের চাপ তৈরি করে ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো হতে পারে। টাকা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানালে ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য প্রকাশের হুমকি দিয়ে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। অর্থাৎ, এ ধরনের প্রতারণায় ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়; ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অনলাইন প্রতারণার পরিধি এখন ঋণকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের বাইরে আরও বিস্তৃত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অস্বাভাবিক বেশি লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার ঘটনাও ঘটছে। এর পাশাপাশি অনলাইন জুয়া, বাজি এবং অনুমোদনহীন ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও আর্থিক লেনদেনকে নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতারকেরা কখনো ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপি সংগ্রহ করেও অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। আবার সরকারি সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ কিংবা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেও মানুষকে প্রতারণার শিকার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সংকটে থাকা মানুষ দ্রুত অর্থের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে অনেক সময় প্রস্তাবের সত্যতা যাচাই করেন না। প্রতারকেরা এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পেজ, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন কিংবা কয়েকটি ইতিবাচক মন্তব্য দেখে অনেকে সেটিকে বৈধ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম মনে করেন। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ঋণ দিচ্ছে বলেই সেটি বৈধ—এমন ধারণা বিপজ্জনক।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, অনলাইন প্রতারণা শনাক্ত ও বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, জুয়া, বাজি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গত মাসে ২০ হাজারের বেশি মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাব শনাক্ত করে বন্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের সাইবার ইউনিটের কাছেও অনলাইন প্রতারণা নিয়ে বিপুলসংখ্যক অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভুক্তভোগীদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
অনলাইন ঋণ বা বিনিয়োগের কোনো প্রস্তাব পাওয়ার পর তাড়াহুড়ো করে টাকা পাঠানো উচিত নয়। বিশেষ করে ঋণ দেওয়ার আগে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জামানত, প্রসেসিং ফি বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক অর্থ দাবি করা হলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার আগে সেটির বৈধতা ও প্রয়োজনীয় অনুমতিগুলো যাচাই করতে হবে। অচেনা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ওটিপি, পাসওয়ার্ড, কার্ডের তথ্য বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া উচিত নয়।
প্রতারিত হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে অভিযোগ করা জরুরি। কারণ নীরবতা প্রতারকদের আরও উৎসাহিত করতে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে অনলাইন আর্থিক প্রতারণাও নতুন রূপ নিচ্ছে। তাই সহজ ঋণ কিংবা দ্রুত লাভের প্রতিশ্রুতি যত আকর্ষণীয়ই হোক, যাচাই ছাড়া একটি ক্লিক বা একটি লেনদেনই বড় আর্থিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।

