মামলার সমন বিবাদীর সঠিক ঠিকানায় যথাযথভাবে জারি হয়েছে—এমন প্রমাণ থাকলে পরে সমন পাননি দাবি করে একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন করা যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ ধারার ১৩ বিধির অধীনে করা আবেদন নিয়ে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি নিম্ন আদালতের রায় ও আদেশের কার্যকারিতার ওপর আগে দেওয়া স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
‘মো. মনজুর রহমান মণ্ডল ও অন্যান্য বনাম লতিফা বেওয়া ও অন্যান্য’ মামলায় এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ২১ জুলাই বিচারপতি মো. রেজাউল করিমের একক বেঞ্চ রায়টি দেন। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।
৯১ একর জমির বিরোধ থেকে মামলা
মামলার সূত্রপাত ২০০০ সালে। ওই বছর লতিফা বেওয়াসহ অন্যরা জয়পুরহাটের সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৯১ একর জমি বাটোয়ারার দাবিতে দেওয়ানি মামলা করেন। এতে মো. মনজুর রহমান মণ্ডলসহ কয়েকজনকে বিবাদী করা হয়। পরের বছর ১৬ আগস্ট বিবাদীদের অনুপস্থিতিতে মামলাটিতে একতরফা ডিক্রি দেওয়া হয়।
বিবাদীদের দাবি ছিল, তাঁদের নামে কোনো সমনই জারি করা হয়নি। মামলার বিষয়েও তাঁরা অবগত ছিলেন না। পরে একতরফা ডিক্রির কথা জানতে পেরে তাঁরা তা বাতিলের উদ্যোগ নেন।
সমন নিয়ে আপত্তি
বিবাদীদের অভিযোগ ছিল, সমন জারির বিষয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন দেখিয়ে বাদীপক্ষ প্রতারণার মাধ্যমে একতরফা ডিক্রি আদায় করেছে। এ অভিযোগে ২০০২ সালের ১৬ জুলাই দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ ধারার ১৩ বিধির অধীনে একতরফা ডিক্রি বাতিল চেয়ে জয়পুরহাটের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন তাঁরা।
তবে নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে ২০০৮ সালের ৬ মার্চ আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেন।
এরপর ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একই বছর জয়পুরহাটের জেলা জজ আদালতে আপিল করেন আবেদনকারীরা। পরে মামলাটি অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে স্থানান্তরিত হয়। ২০১১ সালের ৫ জুন অতিরিক্ত জেলা জজ আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।
হাইকোর্টে গড়ায় বিরোধ
নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে মো. মনজুর রহমান মণ্ডলসহ অন্যরা ২০১২ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন করেন। দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় করা ওই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের রায় ও আদেশের কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।
পরে মামলাটি শুনানির জন্য উঠলে কোনো পক্ষের আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তখন বিচারপতি নিজেই রিভিশন আবেদন, আবেদনকারীদের বক্তব্য, নিম্ন আদালতের নথি এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেন।
সমন নিয়ে কী দেখলেন হাইকোর্ট
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, নিম্ন আদালত ও অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত—দুই আদালতই সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। তাঁদের মতে, মূল মামলার সমন আবেদনকারীদের আরজিতে উল্লেখ করা ঠিকানায় জারি করা হয়েছিল। ওই ঠিকানাটি সংশ্লিষ্ট সময়ে তাঁদের প্রকৃত ঠিকানা ছিল।
শুধু তা-ই নয়, তাঁদের একজন নিকটাত্মীয় সমন গ্রহণ করেছিলেন বলেও সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে আসে। মামলার এক নম্বর আবেদনকারী নিজের জবানবন্দি ও জেরাতেও এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সমন জারির বিষয়টি কেবল অনুমান বা ধারণার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়নি—এমন মত দেন হাইকোর্ট।
একই সিদ্ধান্তে দুই নিম্ন আদালত
আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, নিম্ন আদালতগুলো সমন জারির বিষয়ে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তবে হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে এ দাবি গ্রহণ করেননি।
আদালত বলেন, উভয় নিম্ন আদালত একই সাক্ষ্য ও প্রমাণ বিবেচনা করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সমন জারির ক্ষেত্রে তাঁদের সিদ্ধান্তে কোনো আইনি ত্রুটি বা বেআইনি কিছু পাওয়া যায়নি।
হাইকোর্ট আরও বলেন, নিম্ন আদালতগুলোর যৌথ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার মতো যথেষ্ট কারণ নেই। এ কারণে আগে জারি করা রুলের কোনো সারবত্তা না থাকায় তা খারিজ করা হয়। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের রায় ও আদেশের কার্যকারিতার ওপর দেওয়া স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করে নেন আদালত।
রায়ের মূল বার্তা হলো—বিবাদীর সঠিক ঠিকানায় সমন যথাযথভাবে জারি ও গ্রহণের প্রমাণ থাকলে শুধু সমন পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন টিকবে না।

