গুমের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় বিবেচনার ভিত্তিতে করা হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, গুমের প্রতিটি অভিযোগ সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং ভুক্তভোগী কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তা তদন্তের মাপকাঠি হবে না।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ দাবি জানান গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি।
এ সময় গুমের শিকার প্রায় ৬০টি পরিবারের সদস্য ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
‘রাজনৈতিক বিবেচনায় তদন্ত চাই না’
সানজিদা ইসলাম তুলি অভিযোগ করেন, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সময়ে ‘মায়ের ডাকের’ পক্ষ থেকে দেওয়া গুমের অভিযোগগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় তদন্ত করে বিচারের আওতায় নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
বর্তমান চিফ প্রসিকিউটরের সময়ে যেন এমন কোনো প্রবণতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান।
তাঁর বক্তব্যের জবাবে আমিনুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, গুমের অভিযোগ তদন্তে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা করা হবে না। প্রতিটি অভিযোগকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
২৫০ পরিবারের অভিযোগ, সন্ধান মেলেনি এখনো
চিফ প্রসিকিউটর জানান, গুমের শিকার প্রায় ২৫০ জনের পরিবারের অভিযোগ তাঁদের কাছে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও তদন্তে পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ২৫০ জনের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তাঁদের অপহরণের শিকার হওয়ার বিষয়ে তদন্তে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পর্যায়ক্রমে প্রতিটি পরিবারের সদস্যের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব স্থান থেকে ভুক্তভোগীদের তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব স্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্তে পাঁচ কর্মকর্তা
গুমের অভিযোগগুলোর তদন্তে বর্তমানে পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। আগে একজন তদন্ত কর্মকর্তা এসব মামলার তদন্ত করলেও পরে আরও চারজনকে যুক্ত করা হয়েছে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, গুমের মামলার তদন্ত একাধিক ধাপে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি পরিবার ও প্রতিটি ঘটনার তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করতে হচ্ছে। ফলে সময় লাগছে। তবে বিস্তারিত ও নির্ভুল তদন্তের স্বার্থেই এ সময় প্রয়োজন হচ্ছে বলে তিনি জানান।
তদন্ত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি চিফ প্রসিকিউটর ও অন্যান্য প্রসিকিউটররাও এসব মামলার বিষয়ে সমন্বয় করছেন।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের ঘটনা ‘চলমান অপরাধ’
গুমের শিকার যেসব ব্যক্তির এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি, তাঁদের পরিবারের অভিযোগকে চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে শুধু অতীতে একজন ব্যক্তিকে তুলে নেওয়ার ঘটনা হিসেবে নয়, ভুক্তভোগীর সন্ধান না পাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতিও তদন্তের আওতায় থাকছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয় না। তাই ভুক্তভোগীর পরিবার, অপহরণের স্থান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছু মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
‘কে কোন দলের, তা আলাদা করে দেখব না’
গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব না দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর কেউ গুমের শিকার হয়েছেন কি না, কিংবা ভুক্তভোগী কোনো বিএনপি পরিবারের সদস্য কি না—এভাবে আলাদা করে বিচার করতে চান না তিনি।
বর্তমানে গুমের তিনটি মামলার বিচার চলছে এবং সেগুলো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব মামলায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমানসহ কয়েকজন ভুক্তভোগীর বিষয় রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য, কোনো ভুক্তভোগীর রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই তাঁর গুমের অভিযোগের বিচার অগ্রাধিকার পাবে বা অন্য কারও অভিযোগ গুরুত্বহীন হয়ে যাবে—এমন নীতি অনুসরণ করা হবে না।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীসহ অন্যান্য গুমের ঘটনাগুলোর কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, সব মামলার বিচার একই মাপকাঠিতে করা হবে।
‘শিগগিরই দৃশ্যমান ফলাফল’
গুমের অভিযোগগুলোর তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নিয়ে শিগগিরই দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, গুমের শিকার সব পরিবারের প্রতি তাঁদের আন্তরিক সহানুভূতি রয়েছে। আগের চিফ প্রসিকিউটরের মতো তিনিও এসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করছেন।
তবে গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্ভুল তদন্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারা ভুক্তভোগীদের তুলে নিয়েছিল, তাঁদের কী পরিণতি হয়েছে এবং এসব ঘটনায় কার দায় রয়েছে—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর বের করাই এখন তদন্তের বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তার সমন্বিত কাজ এবং প্রসিকিউশন দলের নজরদারির মাধ্যমে সেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে স্বজনের সন্ধান না পাওয়া পরিবারগুলোর জন্য এখন মূল প্রত্যাশা—তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং শেষ পর্যন্ত সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া।

