ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ ঘোষণা দিয়ে আসলে চোরাইপথে আনা হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার থেকে সাড়ে ছয় কোটি টাকা মূল্যের চারটি বিলাসবহুল গাড়ি—এমন এক জটিল আমদানি কৌশল উদঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট মডেলের গাড়িগুলো একসঙ্গে সম্পূর্ণ অবস্থায় না এনে মাত্র তিন-চারটি বড় অংশে কেটে ‘ইউজড কার পার্টস’ হিসেবে আমদানি করা হয়। এভাবে গাড়ির মূল কাঠামো ভেঙে চালান হিসেবে পাঠানোয় শুরুতে শুল্ক বিভাগের নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
মোংলা বন্দরে আসা এই চালানের শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়। এ কাজে যুক্ত করা হয় সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ দল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, যাদের সম্মিলিত সহায়তায় গাড়িগুলোর প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
চালানের নথি অনুযায়ী, এটি চলতি বছরের ২০ এপ্রিল তারিখে নিবন্ধিত হয় এবং এর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকাভিত্তিক একটি অটোমোবাইল সার্ভিস কোম্পানি। জাপানের একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্যগুলো মোংলা বন্দরে পৌঁছায়। মোট চোদ্দটি আইটেমে ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল, যার সম্মিলিত ওজন প্রায় দশ হাজার দুইশ কেজি। ঘোষণায় দরজা, দুই হাজার সিসি পেট্রোল ইঞ্জিন, গিয়ার অ্যাসেম্বলি, সাসপেনশন, শক অ্যাবজর্বার, হেডলাইট, টেইল লাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং, বাম্পারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কথা উল্লেখ ছিল।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খুলনা অঞ্চলের কাস্টমস গোয়েন্দা দল চালানটির খালাস আটকে দেয় এবং গত ১৯ জুলাই পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা চালায়। পরীক্ষায় দেখা যায়, আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশ হিসেবে দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ওয়্যারিং হারনেস, সেন্সরসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশসহ পুরো সামনের অংশ, পেছনের অংশ, ছাদসহ শরীরের বড় অংশগুলো অক্ষত অবস্থায় সংযুক্ত ছিল। অর্থাৎ পুরো গাড়িকেই মাত্র কয়েকটি বড় খণ্ডে কেটে আনা হয়েছিল, যা পুনরায় জোড়া দিলে সম্পূর্ণ গাড়ির কাঠামো ফিরে পাওয়া সম্ভব বলে প্রাথমিক পরীক্ষায় ধারণা করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে প্রথম যে গাড়িটি শনাক্ত হয়েছে, তা ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যে তৈরি, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য দেশে প্রায় এক কোটি ষাট লাখ থেকে পৌনে দুই কোটি টাকা। দ্বিতীয়টি ২০১০ মডেলের একটি জার্মান গাড়ি, যার আনুমানিক মূল্য ষাট থেকে নব্বই লাখ টাকা। তৃতীয়টি ২০১৬ সালে জাপানে তৈরি একটি বিলাসবহুল এসইউভি, যার সম্ভাব্য দাম দুই কোটি থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা বা তার বেশি হতে পারে। চতুর্থ গাড়িটি জাপানি একটি সেডান মডেল, যেটি সম্পূর্ণভাবে শনাক্ত করা না গেলেও এর আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে চারটি গাড়ির মোট সম্ভাব্য বাজারমূল্য দেশে প্রায় সাড়ে চার কোটি থেকে সাড়ে ছয় কোটি টাকা বা তারও বেশি বলে জানিয়েছে রাজস্ব বোর্ড।
তদন্তে দেখা গেছে, চারটি গাড়ির অংশ চোদ্দ ধরনের ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে ইনভয়েসে দাম দেখানো হয়েছিল মাত্র সাড়ে সাত হাজার ডলারের কিছু বেশি, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় দশ লাখ টাকার কাছাকাছি। এই হিসাবে ঘোষিত শুল্ক-কর ছিল প্রায় ছয় লাখ টাকা, আর মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখানো হয়েছিল ছয় লাখ টাকার সামান্য বেশি। অথচ প্রকৃত বাজারমূল্য অনুযায়ী এই চালানের প্রকৃত মূল্য কয়েক কোটি টাকা, যা থেকে বোঝা যায় কী পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
রাজস্ব বোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, যন্ত্রাংশের আড়ালে বড় বড় খণ্ডে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির এই কৌশল ভবিষ্যতে আমদানি করা গাড়ির চালান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। এই ঘটনার পর একই ধরনের চালান শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই পদ্ধতি আরও জোরদার করার কথা ভাবছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

