সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে ১৪ বছর পর নতুন একটি সূত্র পাওয়ার দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। একটি ভিন্ন মামলার তদন্ত করতে গিয়ে জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কয়েকজনের সম্ভাব্য যোগসূত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটররা।
তদন্তে একজন সাবেক মহাপরিচালক, সেনাবাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তা এবং একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম আলোচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তদন্তের স্বার্থে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। পাওয়া তথ্যগুলো এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন।
রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানান।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে অন্য একটি মামলার সিডিআর ও ইলেকট্রনিক নথি পর্যালোচনা করা হয়। সেখান থেকেই সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র পাওয়া যায়। ওই তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তানভীর জোহা জানান, একজন সাবেক মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলার তদন্তে তাঁর বরিশালের বাসা থেকে বিভিন্ন নথি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ওই ইলেকট্রনিক উপাদানগুলোও জব্দ করে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে ২০০৭ সাল থেকে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন নথি, সার্ভার ও মুছে ফেলা কিছু ফাইল উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তের সময় কয়েকজন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করে তাঁদের একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলেও জানান তিনি। ওই ব্যক্তির প্রাথমিক বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন প্রসিকিউটর জোহা।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন, তৎকালীন র্যাবের দায়িত্বে থাকা এক সাবেক মহাপরিচালক তাঁকে ঘটনার আগের দিন বলেছিলেন, ‘আগামীকাল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।’
প্রসিকিউটর জোহা আরও জানান, তদন্তে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে যে সাগর ও রুনির কাছে বিডিআর হত্যাকাণ্ড অথবা তৎকালীন সরকারের কোনো স্পর্শকাতর তথ্যের নথি থাকতে পারে। এসব তথ্য কোনো ডিস্ক, টেপ, মেমোরি বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংরক্ষিত ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়েকটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিখোঁজ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তাধীন এবং এগুলো সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা করছে না। মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তবে অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পাওয়া সূত্র যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে তা পিবিআইকে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, তদন্তে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্র পাওয়া গেছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, আরও তদন্তের পর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হলে পিবিআইয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তা জানানো হবে। একই সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যা একটি সাধারণ ফৌজদারি মামলা হওয়ায় এর বিচার সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতেই হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। পরদিন সকালে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় ১২ ফেব্রুয়ারি রুনির ভাই নওশের আলী রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। পরে গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে এরপর মামলার তদন্তভার যায় র্যাবের কাছে। বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট তদন্তের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে পিবিআই।
হত্যাকাণ্ডের এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়েনি। সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ১২৯তমবারের মতো বাড়িয়ে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে রহস্যে থাকা এই হত্যাকাণ্ডে নতুন পাওয়া ইলেকট্রনিক তথ্য ও নিখোঁজ ডিভাইসের সূত্র শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর প্রমাণে রূপ নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

