চট্টগ্রাম বন্দর থেকে একটি বিশাল জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমে প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের কাপড়বোঝাই একটি কনটেইনার সরিয়ে ফেলার ঘটনা সামনে এসেছে, যা বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার জন্য আমদানি করা এই কাপড়ের চালানটি ভুয়া কাগজপত্র ও নকল সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করে বন্দরের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে বের করে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বন্দর থানায় দায়ের হওয়া মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় একটি ট্রেইলারযোগে কনটেইনারটি বন্দরের প্রধান ফটক দিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। মামলাটি করেছেন বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন পরিবহন পরিদর্শক। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের দুইজন জেটি কর্মীকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—বন্দরের নিজস্ব ডিজিটাল ব্যবস্থায় কনটেইনার ছাড়ের এন্ট্রি ঠিকই করা হয়েছিল, কিন্তু সেই অনুমোদনের ভিত্তি ছিল সম্পূর্ণ জাল কাগজপত্র। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বন্দরের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা এবং বাস্তব তদারকির মধ্যে একটি বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে, যার সুযোগ নিয়েই এই কারসাজি ঘটানো সম্ভব হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্সির দুই কর্মীকে শনাক্ত করে আটক করেছে এবং পরে তাঁদের পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। বন্দর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন, এ ঘটনায় একটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে এবং দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এই ঘটনায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, গ্রেপ্তার হওয়া দুই কর্মীকে ওই নির্দিষ্ট কনটেইনার খালাসের কাজে নিয়োগই দেওয়া হয়নি, এবং তাঁর লাইসেন্স ব্যবহার করে বা তাঁর জ্ঞাতসারে এমন কিছু ঘটেনি বলেও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন।
জানা গেছে, নিখোঁজ কনটেইনারটি একটি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা পণ্যের চালান, যার খালাসের দায়িত্বে ছিল ভিন্ন একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান। চুরি হওয়ার প্রায় উনিশ দিন পর, ৩০ আগস্ট বন্দরের কনটেইনার ইয়ার্ডে গিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা প্রথম বুঝতে পারেন যে চালানটি সেখানে নেই। এরপর ২ সেপ্টেম্বর বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ তদন্তে নামে।
এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন সাবেক সদস্য মন্তব্য করেছেন, বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনোভাবেই একটি কনটেইনার বন্দর থেকে বের করে নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে, শুধু সাধারণ পর্যায়ের কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করে বিষয়টি সীমিত রাখলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি পুরো ঘটনার গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িত প্রতিটি পক্ষকে চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশপথ চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা কাঠামোয় থাকা দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু থাকলেও তার সঙ্গে সমন্বিত মানব-তদারকি ও যাচাই প্রক্রিয়া না থাকলে যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি উদাহরণ হয়ে থাকল। রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলে এ ধরনের জালিয়াতি অব্যাহত থাকলে তা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

