পাঁচ বছরের জন্য বন্ধক রাখা হয়েছিল জমি। কিন্তু মাত্র দুই বছর পর সেটি বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। জমি ফেরত পেতে শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। মামলা করার সময় জীবিত ছিলেন মালিক ওয়াজ উদ্দিন শেখ, কিন্তু শেষ রায় দেখে যেতে পারেননি তিনি। বাবার সেই মামলা ১৬ বছর ধরে চালিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে আদালতের রায়ে জমির দখল ফিরে পেল তাঁর পরিবার।
ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নের চর নশিপুর গ্রামে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আদালতের নির্দেশে এক একর ৩২ শতক জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এমন দৃশ্যের দেখা যায়। জমির সীমানা নির্ধারণ করে লাল পতাকা টাঙানোর পাশাপাশি ঢাক পিটিয়ে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে এ সময় নাজির, সার্ভেয়ার, অ্যাডভোকেট কমিশনার ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। জমির ওপর থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর নির্ধারণ করা হয় সীমানা। এরপর আদালতের আদেশ অনুযায়ী জমির দখল বুঝে নেন মালিকপক্ষের মাজেদুর রহমান।
পাঁচ বছরের বন্ধক, দুই বছরেই বিক্রির অভিযোগ
জমির বিরোধের শুরু ৫৭ বছর আগে। স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াজ উদ্দিন শেখ ১৯৬৯ সালে এক হাজার ৩০০ টাকার বিনিময়ে এক একর ৩২ শতক জমি পাঁচ বছরের জন্য বন্ধক রাখেন সদর উপজেলার ডিক্রির চর এলাকার আলম খাঁর কাছে।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত পাঁচ বছর শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করেই মাত্র দুই বছর পর আলম খাঁ ওই জমি অন্য এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন।
পরে ওয়াজ উদ্দিন তাঁর জমি ফেরত চাইলে শুরু হয় বিরোধ। জমির দখল ফিরে পেতে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি। একপর্যায়ে বিষয়টি গড়ায় আদালতে।
২০১০ সালে মামলা, রায় দেখতে পারেননি বাদী
নিজের জমি ফিরে পাওয়ার জন্য ২০১০ সালে দেওয়ানি আদালতে মামলা করেন ওয়াজ উদ্দিন শেখ। কিন্তু দীর্ঘ এই আইনি লড়াইয়ের শেষ পরিণতি দেখে যেতে পারেননি তিনি। মামলা চলাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়।
এরপর বাবার করা মামলা চালিয়ে যান ছেলে মাজেদুর রহমান।
নিম্ন আদালতে মাজেদুর রহমানের পক্ষে রায় আসে। কিন্তু তাতেই শেষ হয়নি বিরোধ। প্রতিপক্ষ পক্ষ থেকে একের পর এক আপিল করা হয়। ফলে আদালতের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মামলাটি চলতে থাকে আরও কয়েক বছর।
অবশেষে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে মাজেদুর রহমানের পক্ষে চূড়ান্ত রায় আসে। অর্থাৎ মামলা শুরুর প্রায় ১৬ বছর পর আইনি লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটে।
রায়ের পরও বাকি ছিল দখল বুঝে পাওয়ার প্রক্রিয়া
মামলায় জয় পাওয়ার পরও বাস্তবে জমির দখল বুঝে পাওয়া ছিল আরেকটি ধাপ। উচ্চ আদালতের রায়ের পর আদালতের নির্দেশে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে জমির সীমানা নির্ধারণ করেন। জমির ওপর থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। পরে নির্ধারিত সীমানায় লাল পতাকা টাঙিয়ে জমিটি চিহ্নিত করা হয়।
এরপর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মাজেদুর রহমানের কাছে জমির দখল হস্তান্তর করা হয়।
দখল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় ঢাক পিটিয়ে ঘোষণা দেওয়ার ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করে। পুরোনো দিনের জমিদারি ব্যবস্থায় জমির সীমানা বা দখল ঘোষণা করার সঙ্গে এই দৃশ্যের মিল খুঁজে পান অনেকে।
তবে প্রতীকী এই আয়োজনের আড়ালে রয়েছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একটি জমি-বিরোধ এবং এক পরিবারের দীর্ঘ আইনি অপেক্ষার গল্প।
‘বাবা জমি ফিরে পাওয়া দেখে যেতে পারেননি’
জমির দখল ফিরে পাওয়ার পর মাজেদুর রহমান বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন।
তবে আনন্দের সঙ্গে রয়েছে আক্ষেপও। কারণ, যে জমি ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁর বাবা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, সেই জমি নিজের দখলে দেখে যেতে পারেননি তিনি।
বাবার মৃত্যুর পর ১৬ বছর ধরে মামলা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ের মাধ্যমে পরিবারের জমির দখল ফিরে পেয়েছেন মাজেদুর রহমান।
তাঁর কাছে তাই এটি শুধু একটি জমি ফিরে পাওয়ার ঘটনা নয়; ৫৭ বছর ধরে চলা একটি বিরোধের অবসান এবং এক প্রজন্মের শুরু করা আইনি লড়াই পরের প্রজন্মের হাতে এসে শেষ হওয়ার গল্প।

