কক্সবাজারের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা একাধিক বিলাসবহুল রিসোর্টকে ঘিরে উন্মোচিত হয়েছে এক বিস্ময়কর আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের কর্মকাণ্ড। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে গড়ে তোলা এই চক্রের সদস্যসংখ্যা প্রায় তিনশ, যাদের অবস্থান ছিল মেরিন ড্রাইভ এলাকার বিভিন্ন রিসোর্টে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রতারকচক্র মূলত চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের নিশানা করেছিল। রিসোর্টের ভেতরে তারা রীতিমতো ডিজিটাল ল্যাব বসিয়ে ফেলেছিল, যেখান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো পরিচয়ে সম্পর্ক তৈরি করে বিপুল মুনাফার লোভ দেখিয়ে মানুষকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছিল তারা।
পুলিশি সূত্র থেকে জানা গেছে, এই চক্রের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে স্থানীয় থানায় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণা সংক্রান্ত মামলা দায়ের হয়েছে, যার তদন্তের পরিধি এখন সারা দেশেই বিস্তৃত হচ্ছে। কারণ কেবল সমুদ্রতীরের রিসোর্টেই নয়, এই নেটওয়ার্কের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে আছে দেশের নানা প্রান্তে।
তদন্তকারীদের হিসাবে, চক্রের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় পঁচানব্বইয়ের কাছাকাছি। এর বাইরে আরও প্রায় তিনশ জনের পাসপোর্ট তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। তল্লাশি অভিযানে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা রিসোর্টের গোপন আস্তানায় হানা দিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল, এবং এই মামলার তদন্তভার এখন গ্রহণ করতে যাচ্ছে পুলিশের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ দল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে এই বিশেষ দল দ্রুতই সংশ্লিষ্ট এলাকায় পৌঁছাবে বলে জানা গেছে। পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র সম্প্রতি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে এবং জানিয়েছে, যদি প্রতারকচক্রটি তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করতে পারত, তাহলে এর পরিণতি হতো অত্যন্ত মারাত্মক। অভিযানের সময় উদ্ধার হওয়া প্রায় দুই হাজার স্মার্টফোনের পাশাপাশি একাধিক ল্যাপটপ, কম্পিউটার এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে। এতে একাধিক দেশের সাধারণ মানুষ সম্ভাব্য বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণা থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দুই দফা পরিচালিত অভিযানে মোট প্রায় দুই হাজার স্মার্টফোন, অর্ধশত মনিটর, চুয়াল্লিশটি কম্পিউটার, ত্রিশটি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, চল্লিশটি মাউস, বিদেশি দুটি পতাকা, একটি পরিচয়পত্র সদৃশ ব্যাজ এবং একটি ডায়েরিসহ পাঁচজনকে হাতেনাতে ধরা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও এই চক্রের নজর ছিল।
একদিকে রিসোর্টের ভেতরে অত্যাধুনিক সাইবার ল্যাব, অন্যদিকে হাজারো মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাবের মাধ্যমে গড়ে তোলা লেনদেনের জাল—দুটি মিলিয়ে তৈরি হচ্ছিল এক ভয়াবহ আন্তর্জাতিক প্রতারণা কাঠামো।
দীর্ঘ দশ দিনের গোপন পর্যবেক্ষণ: জানা গেছে, রিসোর্টগুলোতে গড়ে ওঠা এই আস্তানার ওপর জেলা পুলিশ প্রায় দশ দিন ধরে নিবিড় নজরদারি চালিয়েছিল। স্থানীয় পুলিশ সুপার এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন বিভাগের কয়েকজন দক্ষ সদস্যকে। পুলিশ সুপারের ভাষায়, তাদের সবচেয়ে বড় শঙ্কা ছিল কোনোভাবে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে গেলে সম্পূর্ণ অভিযান পরিকল্পনাই ভেস্তে যেতে পারত।
নজরদারির মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিষয়টি জানানো হয়, এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকেও অবহিত করা হয়। দূতাবাস থেকে একটি প্রতিনিধিদল সরাসরি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে হতবাক হয়ে যায় এবং বিস্তারিত তাদের নিজ দেশের কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে। এরপর তারা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানায়, তাদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রচলিত আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সৈকত এলাকার একটি রিসোর্টে বিশাল হলরুম জুড়ে বসানো ছিল কম্পিউটার ল্যাব, আর সংলগ্ন কয়েকটি কক্ষ এমনভাবে নির্মিত যে সেখান থেকে কোনো শব্দ বাইরে যেত না বা বাইরের শব্দ ভেতরে ঢুকত না। প্রযুক্তিতে অত্যন্ত দক্ষ এই চক্রের সরাসরি সদস্য প্রায় পঁচানব্বই জন হলেও তাদের হয়ে কাজ করা লোকের সংখ্যা ছিল দ্বিগুণেরও বেশি। বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিদল দুই দফায় স্থান পরিদর্শনে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
তদন্তকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, জব্দ হওয়া ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় জনপ্রিয় বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপে লোভনীয় তথ্য ছড়িয়ে বিনিয়োগের প্রলোভন দিচ্ছিল চক্রের সদস্যরা। শুরুতে অল্প মুনাফা দেখিয়ে আস্থা অর্জন করে পরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করার কৌশল নিয়েছিল তারা।
তল্লাশি অভিযানের বিস্তারিত: পুলিশের একটি বিশেষ শাখার প্রতিবেদনে একাধিক রিসোর্ট ও আবাসিক ভবনে ব্যাপক সংখ্যক বিদেশি নাগরিকের অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুয়া স্থানীয় নাম ব্যবহার করে একজন বিদেশি নাগরিক গত এপ্রিল মাস থেকেই এসব স্থাপনা ভাড়া নিয়েছিলেন, যার প্রকৃত পরিচয় ভিন্ন। তার সহযোগীরা রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি সম্পাদন করেন। আরেকজন নিজেকে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশে কোম্পানি প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন, কিন্তু অনুসন্ধানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সময়োপযোগী পদক্ষেপ: পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামাল দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষকে অবগত করেই মামলা দায়ের করা হয়।
স্থানীয় আইনজীবী মহলের একাংশ মনে করছে, ঘটনাটি সাধারণ দৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও এর প্রকৃত ব্যাপ্তি অনেক বড়। অতীতে দেশের ব্যাংকিং খাতে অনলাইনভিত্তিক বড় অঙ্কের অর্থ চুরির নজির থাকলেও, বর্তমান প্রশাসনের সময়োপযোগী পদক্ষেপে এবার একই ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে তাদের অভিমত।
চক্রের সন্ধান মেলার পটভূমি: স্থানীয় পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, এই চক্রের কার্যক্রম গত মার্চ মাস থেকেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল, যদিও ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের কাজ শুরুর পরই বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমদিকে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পরিচয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল চক্রের সদস্যরা এবং কর্মসংস্থান ভিসায় দেশে প্রবেশ করেছিল। অভিবাসন সংক্রান্ত দপ্তর তাদের আসার তথ্য জানলেও গোয়েন্দা সংস্থার বিদেশি নাগরিক-সংক্রান্ত শাখা এ বিষয়ে অবগত ছিল না বলে জানা গেছে।
তিনশ বিদেশি নাগরিকের নেটওয়ার্ক: মেরিন ড্রাইভ এলাকার চারটি রিসোর্টে অবস্থানরত ছিলেন দুই শতাধিক বিদেশি নাগরিক। দিনের বেলায় তারা কক্ষের বাইরে বের হতেন না, চলাফেরার জন্য ব্যবহার করতেন কালো কাচের কয়েকটি মাইক্রোবাস, যেখানে মুখ ঢেকে যাতায়াত করতেন। তাদের সহায়তার জন্য নিয়োজিত ছিলেন কয়েকজন স্থানীয় তরুণ। নিজ দেশ থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা রন্ধনশিল্পীদের মাধ্যমে খাবার তৈরি হতো, আর রাতের বেলাতেই মূলত তারা কক্ষ থেকে বের হতেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচজনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি আড়াই থেকে তিনশ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় তিনশ জনের পাসপোর্ট তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—বরং এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক প্রতারকচক্রগুলো কীভাবে প্রযুক্তি ও দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে ভিনদেশের ভূমিতে জাল বিস্তার করতে পারে। এ ধরনের নেটওয়ার্ক ঠেকাতে ভবিষ্যতে অভিবাসন ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

