দেশের বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়েও থাবা বসিয়েছে একটি সংগঠিত জালিয়াত চক্র, যারা আদালতের আদেশ পাল্টে, ভুয়া নথি জুড়ে দিয়ে এবং প্রকৃত তথ্য গোপন করে দাগি আসামিদের কারামুক্ত করার কাজে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এভাবে মুক্তি পাওয়া অনেকে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন, যা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধাক্কা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক রিট মামলার মধ্য দিয়ে এই জালিয়াতির নতুন নতুন কৌশল সামনে এলেও মূল হোতারা এখনো রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই অপরাধ নেটওয়ার্কে শুধু আদালতের কিছু অসাধু কর্মী নন, জড়িত রয়েছেন আইনজীবী, তাদের সহকারী এবং এমনকি ফটোকপি বা কম্পিউটারের দোকানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও। এই চক্রের বিস্তৃতি শুধু সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়—নিম্ন আদালত থেকে কারাগার পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের শিকড় বিস্তৃত। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সাতাশটি মামলার অনুসন্ধানে অন্তত ত্রিশজনের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন আসামি নিজেই, আইনজীবী, তাদের সহকারী, এবং আদালতের কর্মী।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই জালিয়াতি সাধারণ কোনো প্রতারণা নয়, বরং এটি একটি বহু-স্তরীয় সুসংগঠিত প্রক্রিয়া। প্রথমে এমন আসামি বা তার পরিবারকে খুঁজে বের করা হয়, যাদের সহজে জামিন পাওয়া কঠিন বা যারা দীর্ঘদিন কারাগারে আছেন—বিশেষ করে যারা মুক্তির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দিতে প্রস্তুত। বিশ্বাস তৈরির কৌশল হিসেবে ইতিপূর্বে জালিয়াতির মাধ্যমে জামিন পাওয়া আসামিদের উদাহরণ দেখানো হয়। এরপর মামলার এফআইআর, চার্জশিট, নিম্ন আদালতের রায় বা সত্যায়িত অনুলিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংগ্রহ করে তাতে পরিবর্তন আনা হয়—কখনো ভিন্ন মামলার নথি ব্যবহার করে, কখনো তথ্য বাদ দিয়ে বা যুক্ত করে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ জারির পরেও তা বদলে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
এই ধরনের জালিয়াতির মামলাগুলোর সবশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে সন্তোষজনক তথ্য মেলেনি। তারা জানিয়েছে, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মামলাগুলো নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না, যদিও এখন কিছু পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মনে করছেন, দায়ীদের যথাযথ শাস্তি না হওয়াই এই অপরাধ চলমান থাকার মূল কারণ, এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলেই এ ধরনের জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
গত এক বছরে একাধিক ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে এই জালিয়াতি সিন্ডিকেট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের একটি বিদ্রোহী সংগঠন-সংশ্লিষ্ট মামলার এক আসামির জামিন-কারসাজি, যেখানে শুনানিতে উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে পরবর্তী লিখিত আদেশের অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন তদন্ত শুরু করে এবং সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে, যার বিরুদ্ধে এখন বিভাগীয় ও ফৌজদারি মামলা চলছে।
আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, পার্বত্য তিন জেলার একাধিক ইটভাটার মালিক আদালতের একটি সাধারণ রুল জারির আদেশে স্থগিতাদেশ জুড়ে দিয়ে ‘উৎপাদন অব্যাহত থাকবে’ মর্মে বাক্য সংযোজন করে অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জালিয়াতিতে অতিরিক্ত ঊনিশজনের নাম যুক্ত করা হয়, মামলার সঙ্গে সম্পর্কহীন বহিরাগতদের বাদী বানানো হয় এবং আদেশের তারিখও পরিবর্তন করা হয়। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে এই জালিয়াতি ধরা পড়ে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, সুপ্রিম কোর্ট একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আসে। আদালতের সহজলভ্য বিশ্বাসকে অপব্যবহার করে জালিয়াতি করলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি। তার ভাষায়, জামিন জালিয়াতি ছাড়াও টেন্ডার কারসাজি, নোটবাণিজ্য বা রায় জালিয়াতির মতো আদালতকেন্দ্রিক অনিয়মে একটি সংগঠিত চক্র সক্রিয়, যা বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। অতীতে মামলা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব রয়েছে, তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলেই ভবিষ্যতে এমন প্রবণতা কমতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, আদালতের নথি বা আদেশ নিয়ে যেকোনো কারসাজির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হয়, তবে হালনাগাদ তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে দায়ের করা মামলাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও নথি ব্যবস্থাপনা আরও সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তকারী সংস্থার তথ্যমতে, সাতাশটি জামিন জালিয়াতির মামলার মধ্যে আঠারোটি তদন্ত করেছে একটি মেট্রোপলিটন বিভাগ এবং বাকি নয়টি একটি বিশেষায়িত অপরাধ শাখা। এসব তদন্তে ত্রিশজনের বেশি ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যাদের মধ্যে আসামি, আইনজীবী, তাদের সহকারী, তদবিরকারক, আদালতের কর্মী এবং কম্পিউটার দোকানের মালিকও রয়েছেন। জালিয়াতির ধরনও ভিন্ন ভিন্ন—কোথাও মূল অভিযোগের তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে, কোথাও জব্দ করা মাদকের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও গুরুতর অপরাধের তথ্য আড়াল করে কম গুরুত্বের অপরাধ দেখানো হয়েছে। তদন্তকারীরা জানান, শুধু জাল কাগজ তৈরি করাই যথেষ্ট ছিল না—তা বিশ্বাসযোগ্য করতে নথি সংগ্রহ, অনুলিপি তৈরি, টাইপ করা, সিল-স্বাক্ষর সংযোজন এবং শেষে উচ্চ আদালতে উপস্থাপন—প্রতিটি ধাপেই আলাদা ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা ছিল।
একটি ঘটনায় দেখা যায়, দুই হাজার দুইশ পিস মাদকদ্রব্য ও নগদ অর্থ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তি জামিনের সময় উচ্চ আদালতে উপস্থাপিত নথিতে মাদকের পরিমাণ মাত্র কুড়ি পিস দেখিয়ে মুক্তি পান। পরে বিষয়টি নিম্ন আদালতের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের নজরে আসার পর মামলা হয় এবং তদন্তে পনেরোজনের নাম উঠে আসে, যাদের মধ্যে ছিলেন কয়েকজন আইনজীবীও। তদন্তে জানা যায়, কারাগারে থাকা অন্য এক আসামির মাধ্যমে জামিনের প্রস্তাব আসে, পরিবারের সদস্যরা একজন আইনজীবী সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, এবং একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে জাল কাগজ প্রস্তুত করে উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়।
অনুরূপ আরেকটি মাদক মামলায় দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে সাড়ে সাত হাজারের বেশি পিস মাদক জব্দ হলেও উচ্চ আদালতের নথিতে একজন আসামির নামে দেখানো হয় তার প্রকৃত পরিমাণের দশ ভাগের এক ভাগ। মূল নথি তলব করে যাচাইয়ের পর প্রকৃত তথ্য সামনে আসে, এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তার শ্বশুরের পাশাপাশি আদালতের নকল বিভাগের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরে ওই মামলায় মূল আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
একটি অস্ত্র মামলায় জালিয়াতির কৌশল ছিল আরও নাটকীয়—প্রকৃত আসামিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য একজন সম্পূর্ণ কাল্পনিক আসামির অস্তিত্ব তৈরি করে জাল এজাহার ও জব্দ তালিকায় অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা তার নামে চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর প্রকৃত অপরাধীকে দেখানো হয় গুরুত্বহীন দ্বিতীয় আসামি হিসেবে। এই ঘটনার তদন্তসূত্র বেরিয়ে আসে একটি জব্দ করা চিঠির খাম থেকে, যা পরিবহন সংস্থার মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। তদন্তে দেখা যায়, একটি জেলা শহরের কম্পিউটারের দোকানে বসেই এজাহার, জব্দ তালিকা ও চার্জশিটের তথ্য পরিবর্তন করে তা উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, আদালতের অভ্যন্তরীণ কর্মী-কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতাও একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। এক ঘটনায় হাইকোর্টের তদন্ত কমিটি ফৌজদারি শাখার নয়জন কর্মী-কর্মচারীকে চিহ্নিত করে, যারা দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মামলার তদবির করতেন। সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, জালিয়াতির কৌশল বদলে প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামিকে জাল জন্মসনদের মাধ্যমে শিশু দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল, যার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, তার সহকারী এবং একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেয় আদালত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের জালিয়াতি আদালতের প্রযুক্তিনির্ভর নথি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতির একটি প্রকট উদাহরণ। যতদিন না দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন এই সংগঠিত অপরাধ চক্র নতুন নতুন কৌশলে সক্রিয় থাকার আশঙ্কাই থেকে যাচ্ছে।

