চট্টগ্রামের আমদানিকারক নুরুল হুদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নামে ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখা থেকে ১ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানের নামে ২ দশমিক ৩৬ কোটি টাকার পণ্য আমদানির রেকর্ডও রয়েছে। কিন্তু এই ব্যবসায়ী দাবি করছেন, তিনি ঋণের টাকা বা আমদানিকৃত পণ্য, কোনোটিই হাতে পাননি। অভিযোগ উঠেছে, ইসলামী ব্যাংকের ছয়জন কর্মকর্তা যোগসাজশ করে তার স্বাক্ষর নকল করে এবং ব্যাংকে সংরক্ষিত খালি চেক ব্যবহার করে এসব ঋণপত্র (এলসি) খোলেন ও ঋণ অনুমোদন করেন। চট্টগ্রাম সিআইডির তদন্তে এই অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে এবং ফরেনসিক পরীক্ষায় স্বাক্ষরের স্পষ্ট অমিল ধরা পড়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৯ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখায় মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নামে একটি চলতি হিসাব খোলেন নুরুল হুদা। আমদানি ব্যবসার জন্য তিনি ব্যাংকটির সঙ্গে নিয়মিত লেনদেন করছিলেন। প্রতিবার এলসি খোলার সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে অলিখিত, শুধু স্বাক্ষর করা খালি চেক নিতেন। ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম ও সেকেন্ড অফিসার মো. মহিউদ্দিনের নির্দেশে ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জুবায়ের আলম চৌধুরী এসব চেক সংগ্রহ করতেন। কথা ছিল, নুরুল হুদার আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে আসার পর পণ্য খালাস শেষে তার কাছ থেকে টাকা কর্তনের সময় এসব চেক ব্যবহার করা হবে। কিন্তু অভিযুক্তরা কৌশলে ব্যাংকের ভাউচারের সাহায্যে টাকা পরিশোধ করতেন এবং পরে নুরুল হুদার কাছ থেকে নেওয়া চেকগুলো ফেরত না দিয়ে নিজেদের হেফাজতে রেখে দেন।
পরবর্তীতে এসব চেক এবং ব্যাংকে সংরক্ষিত নুরুল হুদার স্বাক্ষর করা খালি এলসি অনুমোদন ফরম ও অন্যান্য নথি ব্যবহার করে তার অজান্তে পাঁচটি মেয়াদি মুদারাবা পোস্ট ইমপোর্ট (এমপিআই) ঋণ হিসাব খোলা হয়। তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্তরা এই ব্যাংক হিসাবের এসএমএস অ্যালার্ট সেবা বন্ধ করে দেন। ফলে টাকা জমা বা উত্তোলনের কোনো নোটিফিকেশন নুরুল হুদার কাছে পৌঁছাত না। পাঁচটি ঋণ হিসাবের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪২ টাকার ঋণ সৃষ্টি করা হয়। এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হয় আগে তৈরি করা আমদানি দায় সমন্বয়ের জন্য। পরে কিছু টাকা পরিশোধ করা হলেও নুরুল হুদার প্রতিষ্ঠানের নামে ৮৭ লাখ ১৫ হাজার ২৮৩ টাকা বকেয়া রয়েছে।
আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নাম ব্যবহার করে চীন থেকে চায়না আপেল, চায়না আদাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নানা ধরনের পণ্য আমদানি করা হয়। সিআইডির হিসাব অনুযায়ী, এসব আমদানির মোট মূল্য ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫১৫ ডলার (প্রায় ২ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা)। নুরুল হুদার অজান্তে রমিজ ও মনির নামের ব্যক্তিসহ অভিযুক্তদের প্রতিনিধিরা এসব পণ্য খালাস করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর সেগুলো দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে মুনাফা অর্জন ও আত্মসাৎ করা হয়। নুরুল হুদা জানিয়েছেন, তিনি ২০২১-২২ সালে সৌদি আরব থেকে খেজুর আমদানির জন্য খুলশী শাখার মাধ্যমে অন্তত ২৫টি এলসি খোলেন। কিন্তু পরে জানতে পারেন, তার হিসাব ব্যবহার করে সৌদি আরবের পাশাপাশি দুবাই, ভিয়েতনাম ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের নামে এলসি খোলা হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঋণ পরিশোধের নোটিশ পাওয়ার পর তিনি প্রথম এই ঋণ ও পণ্য আমদানির বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর ব্যাংকে গিয়ে ঋণের নথি দেখতে চাইলে তিনি দেখতে পান, তিনি নিজে কোনো ঋণ নেননি এবং কোনো ঋণ আবেদনপত্রে স্বাক্ষরও করেননি।
আদালতের নির্দেশে বিতর্কিত ঋণসংক্রান্ত নথি সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয় এবং হস্তলিপি বিশারদের মতামত নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত নথিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে নুরুল হুদার স্বাক্ষরের স্পষ্ট অমিল পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর আদালতে দায়ের করা মামলায় দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪০৬, ৪২০, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় নয়জনকে আসামি করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সিআইডির উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুল করিম ৪ ডিসেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে ছয়জন ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, দালিলিক জালিয়াতি, জাল দলিল ব্যবহার ও হুমকির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। অভিযুক্তরা হলেন, খুলশী শাখার সাবেক ম্যানেজার মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম, তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার মো. মহিউদ্দিন, ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জুবায়ের আলম চৌধুরী, জুনিয়র অফিসার রাফায়েত সালাহ উদ্দিন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মওলা ও সাবেক চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। শুনানির পর ৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট চতুর্থ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মোস্তফা সাতজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। সিআইডি তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করে, ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ জোনাল অফিস সাউথের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ জহির উদ্দিন, মিয়া মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ ও মুহাম্মদ জুবায়ের আজম হেলালী।
নুরুল হুদা টিবিএসকে জানিয়েছেন, ঘটনার পর তিনি একাধিকবার ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখা, এমডি ও চেয়ারম্যানসহ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। কর্মকর্তারা সমাধানের আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাকে গালিগালাজ, মামলা দিয়ে ফাঁসানো ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের আইনি নোটিশ দেন এবং শেষপর্যন্ত আদালতের আশ্রয় নেন। মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলাটি বর্তমানে চার্জ শুনানির পর্যায়ে রয়েছে এবং সিআইডির চার্জশিট জমা হওয়ার পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর প্রাথমিক ধাপে পৌঁছেছে। তিনি আরও জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির নীতি অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে অধস্তন কর্মচারীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ভার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপরই বর্তায়।

