২০২৬ সালের জুন প্রান্তিকে দেশের এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি আগের প্রান্তিকের ৫০ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকার তুলনায় ১.১২ শতাংশ বেশি। এই বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৫৬৬ কোটি টাকা। এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে বর্তমানে ৩০টি ব্যাংক সেবা দিচ্ছে। গত জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ২৫৬টিতে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২.৭৭ শতাংশ বেশি। শুধু ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে এই অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩টি। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৭ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি।
আমানতের বড় অংশই আসছে গ্রাম থেকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট আমানতের ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশ বা ৪২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা গ্রামীণ এলাকার আমানতকারীদের। গ্রামীণ অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৭৫৫টি, যা মোট অ্যাকাউন্টের ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মূল বিস্তার ঘটেছে গ্রামে। নারী গ্রাহকদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। মোট অ্যাকাউন্টের ৫০ শতাংশের কাছাকাছি বা ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯১৮টি হিসাব নারীদের নামে খোলা হয়েছে। আমানতের হিসাবে পুরুষ গ্রাহকদের কাছে ২৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা এবং নারী গ্রাহকদের কাছে ১৯ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা রয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, গত জুন পর্যন্ত এক বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
তবে আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণে গ্রামীণ গ্রাহকরা এখনও পিছিয়ে। জুন প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা, যা মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি এবং এক বছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪১ শতাংশ। কিন্তু মোট আমানতের চার-পঞ্চমাংশেরও বেশি (প্রায় ৮১%) আসে গ্রাম থেকে, অথচ গ্রামীণ গ্রাহকরা মোট ঋণের মাত্র ৬৪ শতাংশ বা ২৬ হাজার ২২৬ কোটি টাকা পেয়েছেন। অন্যদিকে শহরাঞ্চল, যেখান থেকে মোট আমানতের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ আসে, সেখানে গেছে মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ। শতাংশের হিসাবে এটি গ্রামের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব বলেছেন, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থায়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু ঋণ বিতরণের তথ্য বলছে, সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।
প্রতিবেদনে লিঙ্গভিত্তিক ঋণ বিতরণে বড় বৈষম্যও উঠে এসেছে। জুন শেষে পুরুষ ঋণগ্রহীতারা মোট ঋণের ৮৪ শতাংশ পেয়েছেন, আর নারী ঋণগ্রহীতারা পেয়েছেন মাত্র ১৩ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নারীরা মোট আমানতের ৩৭ শতাংশ রেখেছেন এবং অ্যাকাউন্টের প্রায় অর্ধেকই নারীদের। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই পরিসংখ্যান গ্রামীণ উদ্যোগে নারী গ্রাহকদের সীমিত অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয়। তবে গ্রামে আরও নারী উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে তাদের ব্যাংকঋণে সহায়তা করার বড় সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিষয়ে নজর রাখছে এবং ব্যাংকগুলোকে নারী গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে বড় পাঁচটি ব্যাংকের আধিপত্য স্পষ্ট। ৩০টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনা করলেও ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান মিলে দেশের প্রায় ২০ হাজার ৬০০টি আউটলেটের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একক অংশ ২৭ শতাংশ, এরপর ব্যাংক এশিয়া ২৫ শতাংশ। মোট ২ কোটি ৭২ লাখ অ্যাকাউন্টের মধ্যে এই পাঁচ ব্যাংকের হিস্যা ৮৯ শতাংশ, যার মধ্যে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একারই ৩০ শতাংশ। আমানতের ক্ষেত্রেও শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের অবস্থান প্রায় একই। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উচ্চ ঘনত্বের কারণে ছোট ব্যাংকগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মূল লক্ষ্য, প্রান্তিক মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া, তা অর্জনে এই একচেটিয়া প্রবণতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমানত বাড়লেও এজেন্ট ও আউটলেট সংখ্যায় মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। জুন শেষে মোট এজেন্টের সংখ্যা ১৫ হাজার ৪২৪ জন, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। মোট আউটলেট ২০ হাজার ৫৯৭টি, যা ১ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে এজেন্টের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ১৮৪ এবং আউটলেট ২০ হাজার ৩৩৯টি, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বড় ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই সময় পরিসংখ্যানে প্রভাব পড়েছিল। এখন পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। মোট অ্যাকাউন্টের মধ্যে ২৩টি ব্যাংক ঋণ বিতরণ করছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বিতরণও একটি বড় খাত। তবে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি রেমিট্যান্স গ্রামে গেছে। সামগ্রিকভাবে জুন প্রান্তিকের তথ্য বলছে, এজেন্ট ব্যাংকিং আমানত সংগ্রহে শক্ত অবস্থানে থাকলেও ঋণ বিতরণে গ্রাম-শহরের বৈষম্য এবং নারী ঋণগ্রহীতাদের কম অংশগ্রহণ আগামী দিনে নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

