আদালতে উমেদার নিয়োগ নিষিদ্ধ করে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে প্রায় এক যুগ ধরে। তবু ঢাকার অধস্তন আদালতগুলোতে এখনো শত শত উমেদার কাজ করছেন। আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথি দেখা, নকল তোলা, ওকালতনামা ও জামিননামা জমা দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজের জন্য তাঁদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজের বিনিময়ে ‘বকশিশ’ নামে টাকা নেওয়া হয়। কোথাও কোথাও এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে আদালতের নথি চুরি, গায়েব কিংবা জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে। ফলে যে আদালতে আইনের শাসন নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানেই অনানুষ্ঠানিক এক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন বিচারপ্রার্থীরা।
সম্প্রতি ঢাকার দুটি আদালত থেকে মামলার নথি চুরির ঘটনায় উমেদারদের ভূমিকা সামনে এসেছে।
ঘুষ নিয়ে মামলার নথি তুলে দেওয়ার অভিযোগ
ভাটারা থানার একটি মাদক মামলায় আসামি রবিউল হক মিয়ার নথি চুরির ঘটনায় এমনই একটি ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল ওরফে ‘মুরগি’ রাসেল মাস্ক পরে ঢাকার ৮ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যান। সেখানে কর্মরত উমেদার হিমেল ওরফে সাদ্দামকে এক হাজার টাকা দিয়ে মামলার নথি দেখতে চান তিনি।
অভিযোগ, সাদ্দাম তাঁর হাতে নথি তুলে দিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে রাসেল নথি নিয়ে চলে যান। পরে আদালতের অফিস সহায়ক সুমন তালুকদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। তবে নথি তুলে দেওয়ার ঘটনায় উমেদার সাদ্দামকে মামলার আসামি করা হয়নি।
এর আগে গত ২ জুলাই ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকেও একটি অস্ত্র মামলার নথি চুরির ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে নথিটি চুরির পরিকল্পনা করা হয়। চক্রের সদস্য রাসেল প্রথমে আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান ওরফে রনিকে এক হাজার টাকা দেন। এরপর সংশ্লিষ্ট মামলার নথি নিয়ে চলে যান। এ ঘটনায় মামলা হলেও উমেদার রনিকে আসামি করা হয়নি।
শুধু নথি চুরি নয়, মারধরের অভিযোগও
উমেদারদের বিরুদ্ধে শুধু নথি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নয়, বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং মারধরের অভিযোগও রয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারকের খাস কামরায় ঢাকা রেলওয়ে থানার এক উপপরিদর্শককে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ, আদালতের উমেদার শাহিন সেখানে তাঁকে মারধর করেন।
ঘটনাটি নিয়ে বিচারককে আইন মন্ত্রণালয় থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও উমেদার সরকারি কর্মচারী না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হাইকোর্টের নির্দেশ ছিল উমেদার নিষিদ্ধ
আদালতে উমেদারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগ থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া বহিরাগত ব্যক্তিদের মাধ্যমে আদেশ বা মামলাসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি লিপিবদ্ধ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিরাগতদের মাধ্যমে আদালতের আদেশ বা মামলাসংশ্লিষ্ট বিষয় লিপিবদ্ধ করা আইনবহির্ভূত ও উদ্বেগজনক। এতে গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথি হারিয়ে যাওয়া, ঘষামাজা কিংবা গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল। নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল।
কিন্তু প্রায় এক যুগ পরও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
ঢাকার আদালতেই শত শত উমেদার
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার অধস্তন আদালতগুলোতে পাঁচ শতাধিক উমেদার কাজ করছেন।
ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের অধীন ৩৭টি আদালতে ৭২ জন উমেদার রয়েছেন। ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীন নয়টি আদালতে রয়েছেন প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন আদালতগুলোতে রয়েছেন আরও প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ জন।
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধীন আদালতগুলোতে উমেদারের সংখ্যা প্রায় ১১২। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল, মানবপাচার ট্রাইব্যুনাল ও অর্থঋণ আদালতের বিভিন্ন শাখাতেও উমেদার কাজ করছেন।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের বিভিন্ন শাখাতেও দীর্ঘদিন ধরে উমেদাররা কাজ করছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মামলার নথি দেখা, নকল তোলা, ওকালতনামা ও জামিননামা জমা, দ্রুত সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাঠানোসহ বিভিন্ন কাজে তাঁদের ‘বকশিশ’ দিতে হয়।
‘সরকারি কর্মী না থাকায় উমেদার রাখতে হচ্ছে’
আদালতে উমেদার রাখার পক্ষে মূল যুক্তি হিসেবে উঠে এসেছে জনবল সংকটের বিষয়টি।
ঢাকার একটি জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পেশকার মো. রাশেদ বলেন, তাঁর আদালতে সরকারিভাবে পেশকার ও একজন অফিস সহায়ক রয়েছেন। এত কাজ তাঁদের দুজনের পক্ষে সামলানো কঠিন হওয়ায় দুজন উমেদার রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মো. রেজোয়ান খন্দকারও দীর্ঘদিন ধরে আদালতে জনবল সংকটের কথা বলে আসছেন। তাঁর মতে, একই পদে দীর্ঘদিন কাজ করেও অনেক সরকারি কর্মচারী পদোন্নতি পান না, আবার নতুন নিয়োগও হয় না। ফলে আদালতের কাজ চালাতে উমেদারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. শাহজাহান সাজুর বক্তব্যও একই দিকে। তিনি বলেন, আদালতে কাজের চাপের তুলনায় সরকারি কর্মচারী কম থাকায় উমেদার ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের কেউ ফাইল খুঁজে দেন, কেউ নথি এগিয়ে দেন এবং অনেক সময় প্রক্রিয়াগত আদেশও লিখে থাকেন। তবে বিচারিক আদেশ লেখার এখতিয়ার তাঁদের নেই।
‘উমেদার তুলে দিলে কমবে ঘুষ’
আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করেন, উমেদারদের ওপর আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কাজের নির্ভরতা বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম হিমেলের অভিযোগ, উমেদাররা টাকা ছাড়া অনেক কাজ করতে চান না। বাইরের কেউ টাকা দিয়ে তাঁদের মাধ্যমে মামলার নথি হাতে পেয়ে গেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস বা নথি চুরির সুযোগ তৈরি হয়।
তাঁর মতে, উমেদারদের পরিবর্তে পর্যাপ্ত সরকারি কর্মচারী নিয়োগ করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেন দুটোই কমানো সম্ভব।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হারুনুর রশিদ বলেন, প্রতিটি আদালতে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা খুবই কম, অথচ প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মামলার শুনানি হয়। ফলে বাস্তব প্রয়োজনেই উমেদারদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। তাঁর মতে, সরকার চাইলে অভিজ্ঞ উমেদারদের নিয়োগের মাধ্যমে জনবল সংকটের সমাধান করতে পারে।
প্রশ্ন শুধু উমেদারদের নয়, জবাবদিহিরও
উমেদারদের নিয়ে মূল প্রশ্নটি কেবল তাঁদের উপস্থিতি নয়; বরং আদালতের নথি ও কার্যক্রমে তাঁদের প্রবেশাধিকার এবং এর জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি না থাকা।
একদিকে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে আদালতে বহিরাগতদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কাজ না করানোর। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীর ঘাটতির কারণে সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না। এর মধ্যেই নথি চুরি, নথি গায়েব এবং ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে।
ফলে উমেদারি প্রথা বন্ধ করতে শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করাই যথেষ্ট নয়। আদালতের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি জনবল নিশ্চিত করা, নথি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার নির্ধারণ—এই তিন ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কারণ বিচারপ্রার্থীর কাছে আদালতের নথি শুধু একটি কাগজ নয়; সেটিই তাঁর অধিকার, মামলা ও ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেই নথির নিরাপত্তা যদি অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তিদের হাতে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়েই।

