ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে অনিয়মিতভাবে সীমান্ত পারাপারের ঘটনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। তবে এই ইতিবাচক খবরের মধ্যেও একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে, ভূমধ্যসাগরের প্রধান দুটি সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশে বাংলাদেশিরা শীর্ষস্থানে রয়েছেন। ইউরোপের সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট ৭৫ হাজারের মতো অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ কম। শুধু আগস্ট মাসেই প্রায় ১০ হাজার ৭০০টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম।
ফ্রন্টেক্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথটি ছিল সবচেয়ে ব্যস্ত অভিবাসনপথ। এ পথে প্রথম আট মাসে ২৪ হাজার ২০০-এর বেশি সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। লিবিয়া থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপমুখী করিডরটি ছিল এ পথের সবচেয়ে সক্রিয় অংশ। আগস্টে এ পথে প্রায় ৩ হাজার সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এ পথে শনাক্ত হওয়া অভিবাসীদের প্রধান জাতীয়তার মধ্যে ছিলেন আফগান, সুদানি ও বাংলাদেশি নাগরিক। এদিকে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জনের ইউরোপে প্রবেশ শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কম। এই পথে শনাক্ত হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি, সোমালি ও আলজেরীয় নাগরিকদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি এই কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় পথ দিয়ে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতার পেছনে মূলত বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য ইউরোপে যাওয়ার বৈধ ও সাশ্রয়ী পথ সংকুচিত হয়ে আসছে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ায় বিকল্প খুঁজছেন অনেকে। তৃতীয়ত, মানব পাচারকারী চক্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আরও সংগঠিত ও প্রলোভনমূলকভাবে কাজ করছে। চতুর্থত, লিবিয়া ও তুরকি হয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর রুটটি বাংলাদেশিদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত, যেখানে পাচারকারীরা তরুণদের ‘সোনালি ভবিষ্যৎ’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, এই পথে যাত্রা করা বেশিরভাগ মানুষ ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী এবং মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জের মতো ১০ থেকে ১২টি জেলার বাসিন্দা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা লিবিয়ায় পৌঁছান, তাদের ৭৫ শতাংশ কাজ খুঁজে পান না, ৯৩ শতাংশকে জিম্মি করা হয়, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এবং ৬৯ শতাংশ স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার হারান।
অনিয়মিত প্রবেশ কমলেও মানবিক মূল্য কিন্তু কমেনি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু আগস্ট মাসেই লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া একটি ছোট নৌকায় ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জন ছিলেন বাংলাদেশি। ১১ দিন সমুদ্রে ভেসে থাকার পর ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিক তীব্র গরম ও খাদ্য-পানির অভাবে মারা যান। লিবিয়ার ক্যাম্পে বাংলাদেশিদের নির্যাতনের অভিযোগও নতুন নয়। পাচারকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা দাবি করে এবং নির্যাতন চালায়।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে মানব পাচার প্রতিরোধে একাধিক আইন ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন প্রণয়ন করা হয় এবং ২০২৬ সালে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন’ নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া পাচারকারীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং তাদের চলাচল সীমিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, পাচার মামলায় বিচারের হার এখনো অত্যন্ত কম। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ মামলায় অভিযোগ গঠন হয়েছে এবং ৯৫ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশিদের এই উপস্থিতি দেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান তৈরি হচ্ছে এবং বৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীরাও এই কারণে বাড়তি scrutiny-র মুখে পড়ছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করেছে এবং লিবিয়া ও তিউনিসিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে আইওএম-এর সহায়তায় কাজ করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট সমাধান করতে হলে ইউরোপে বৈধ অভিবাসনের পথ বাড়ানো, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন, এবং তরুণদের জন্য দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি; এই তিনটি ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

