কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত ঢুকছে ইয়াবা। মিয়ানমার সীমান্ত পার হয়ে পাহাড়ি পথ, ভাঙা সড়ক আর অলিগলি ঘুরে এই মাদক পৌঁছে যাচ্ছে কক্সবাজার শহরসহ দেশের নানা প্রান্তে। পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত পথ বদলাচ্ছে, নিচ্ছে নতুন কৌশল। ফলে সীমান্তে চালান ধরা পড়লেও থামছে না এর প্রবাহ। এই বাস্তবতায় সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত পুরো পথটাকেই নজরদারির আওতায় আনতে চাইছে পুলিশ, যার কেন্দ্রে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি।
কক্সবাজার ও বান্দরবানের গুরুত্বপূর্ণ ১১টি স্থানে স্থায়ী তল্লাশিচৌকি বসানোর একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ। এসব চৌকিতে বসবে মুখ শনাক্তকরণে সক্ষম এআই ক্যামেরা, সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা, মাদকের গন্ধ শনাক্তকারী কুকুরের দল বা ডগ স্কোয়াড, এবং গাড়ি ও লাগেজ পরীক্ষার জন্য স্ক্যানার। গত ২৭ জুলাই এই প্রস্তাব পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। চৌকিগুলো পরিচালনার জন্য চাওয়া হয়েছে ৩২১ জন পুলিশ সদস্য, আর যন্ত্রপাতি-অবকাঠামো বাবদ খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা।
কেন এত বড় আয়োজন, তার উত্তর মিলছে জব্দের পরিসংখ্যানেই। ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সীমান্তরক্ষী বাহিনী একাই জব্দ করেছে দেড় কোটির বেশি ইয়াবা বড়ি, আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে ধরা পড়েছে সাড়ে চার কোটির বেশি। এত বিপুল পরিমাণ জব্দের পরও পাচার থামছে না, বরং নতুন নতুন কৌশলে তা চলছেই।
প্রস্তাব প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম রেঞ্জের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখেই এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—কোনোভাবেই যেন ইয়াবা দেশের ভেতরে ঢুকতে না পারে। তাঁর ভাষ্য, সন্দেহভাজন কারবারিদের প্রথমে চৌকিতে আটকানো হবে। সরাসরি শনাক্ত করা না গেলে কাজ করবে এআই ক্যামেরা, যেখানে আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকবে পরিচিত কারবারি ও তাদের সহযোগীদের ছবি। এলাকায় প্রবেশমাত্রই তারা ধরা পড়ে যাবে ক্যামেরার চোখে। এরপরও গাড়ি বা লাগেজে লুকানো মাদক থাকলে তা ধরবে স্ক্যানার, আর প্রয়োজনে নামানো হবে ডগ স্কোয়াড।

পুলিশের পর্যবেক্ষণ বলছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নাফ নদী, সমুদ্রপথ এবং বিভিন্ন সীমান্তবর্তী পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা প্রবেশ করে বাংলাদেশে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তকে চিহ্নিত করা হয়েছে সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রবেশপথ হিসেবে। তবে পুলিশ মনে করছে, শুধু সীমান্তে চোখ রাখলেই চলবে না, কারণ সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার পর মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হয় বিকল্প সড়ক আর পাহাড়ি রাস্তা। এসব পথ যেখানে মূল সড়কের সঙ্গে মিশেছে, ঠিক সেই সংযোগস্থলগুলোতেই বসানো হবে স্থায়ী চেকপোস্ট। এ জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে কক্সবাজারের রামু, সদর, উখিয়া ও চকরিয়ার সাতটি এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চারটি স্থান।
প্রস্তাবিত ১১টি চৌকির মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিসরে গড়ে তোলা হবে মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যা কক্সবাজার শহর ও পর্যটন এলাকায় মাদক প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ বলে বিবেচিত। সেখানে মোতায়েন থাকবেন ৪২ জন পুলিশ সদস্য, যাঁরা তিন পালায় ভাগ হয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। থাকবে একটি করে ডগ স্কোয়াড, লাগেজ স্ক্যানার ও ভেহিক্যাল স্ক্যানার, তিনটি এআই মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং পনেরোটি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা। এই একটি চৌকির অবকাঠামো নির্মাণেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা।
শুধু প্রধান সড়ক নয়, পুরোনো ও কম পরিচিত পথগুলোও নজরদারির বাইরে রাখছে না পুলিশ। উখিয়ার একটি পুরোনো বনবিভাগ সংলগ্ন এলাকা চিহ্নিত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে, কারণ টেকনাফ ও উখিয়া থেকে পুরোনো সড়ক ধরে মাদক আনার প্রবণতা রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ। সেখানে বসবে ৩৩ সদস্যের একটি চৌকি। রামুর একটি বৌদ্ধবিহার এলাকাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়েছে, কারণ পার্বত্য এলাকা থেকে আসা মাদক এখান দিয়েই মূল সড়কে ওঠার সম্ভাবনা বেশি। একইভাবে গর্জনিয়ার একটি চৌরাস্তার মোড়কে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়েছে, কারণ এটি দুর্গম বনাঞ্চলঘেরা পাহাড়ি এলাকার চার রাস্তার মিলনস্থল।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ সীমান্তঘেঁষা সরু পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে মাদক আসার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি সেখানে। এই উপজেলায় প্রস্তাব করা হয়েছে তিনটি পৃথক স্থায়ী চৌকি, প্রতিটিতে থাকবেন ৩৩ জন করে পুলিশ সদস্য। এর একটি থানা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের একটি পাহাড়ি সংযোগস্থলে, যা মাদক পরিবহনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আরেকটি চৌকি বসবে চার রাস্তার একটি মিলনস্থলে, যেখানে যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালানো তুলনামূলক সহজ হবে বলে পুলিশের ধারণা।
পুরো পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে প্রযুক্তি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১টি চৌকি মিলিয়ে মোট ৩১টি এআই-ভিত্তিক মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ১৪০টি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। সন্দেহভাজন কারবারি ও তাদের সহযোগীদের ছবি আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকবে এআই ব্যবস্থায়, যাতে তারা কোনো চৌকির আওতায় প্রবেশ করামাত্র শনাক্ত হয়ে যায়। এর পাশাপাশি থাকবে ছয়টি গাড়ি স্ক্যানিং মেশিন, প্রতিটির দাম প্রায় সোয়া কোটি টাকার বেশি, মোট ব্যয় সাড়ে নয় কোটি টাকার কাছাকাছি। আটটি লাগেজ স্ক্যানারের জন্য ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। এ ছাড়া এআই ফেস ডিটেকশন সফটওয়্যার এবং মনিটরিংয়ের জন্য বড় পর্দার টেলিভিশন বসানোর খরচও যুক্ত হয়েছে প্রস্তাবে। পুলিশের বিশ্বাস, চোখে ধুলো দিয়ে গাড়ি বা লাগেজে মাদক লুকানোর সুযোগ এসব প্রযুক্তির কারণে অনেকটাই কমে আসবে।
মাদকবিরোধী পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করা একটি সংগঠনের চট্টগ্রাম শাখার একজন প্রতিনিধি। তাঁর মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, বরং পাচারের রুট বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। তাঁর পর্যবেক্ষণ, একটি পথ বন্ধ হলে কারবারিরা দ্রুত অন্য পথ খুঁজে নেয়। তাই সীমান্ত, পাহাড়ি পথ, বিকল্প সড়ক, রেলপথ এবং শহরে ঢোকার প্রতিটি পয়েন্টে একসঙ্গে ও সমন্বিতভাবে নজরদারি চালাতে হবে। কোথাও ঘাটতি থাকলে পুরো চক্রটি ভাঙা কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে প্রস্তাবটি এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো এই পরিকল্পনার অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া মেলেনি। ফলে কবে নাগাদ এসব চৌকি বাস্তবে দাঁড়াবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে সীমান্তের পরবর্তী প্রতিটি ধাপে তৈরি হবে একের পর এক নজরদারির বলয়, আর লক্ষ্য থাকবে একটাই—শহরে পৌঁছানোর আগেই আটকে দেওয়া প্রতিটি চালান।

