সড়ক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দিয়ে সরকারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটি পরিকল্পিত ছক ধরা পড়েছে নরসিংদীতে। একটি সড়ক প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রাথমিক প্রস্তাবে যতটা জমি চাওয়া হয়েছিল, পরে তদন্তে তার একটি বড় অংশ অপ্রয়োজনীয় বলে বাদ পড়ে যায়, আর এই বাদ পড়ার কারণেই সরকারের প্রায় একশো দশ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের আওতায় নরসিংদী অংশে একটি নির্দিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ মামলার নথিতে দেখা যায়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রস্তাবে চৌদ্দ একরের বেশি জমি চাওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন জেলার তখনকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। তদন্তের পর জমির পরিমাণ কমে আসে প্রায় এগারো একরে, এবং সবশেষ যাচাইয়ের পর তা আরও কমে চূড়ান্তভাবে প্রায় সাড়ে নয় একরে স্থির হয়। অর্থাৎ শুরুর প্রস্তাব ও শেষ পর্যন্ত অধিগ্রহণ করা জমির মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় সাড়ে চার একরের মতো, যার ফলে সরকারের সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ খরচ কমে যায় প্রায় একশো দশ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, এই ধরনের মোট আটটি মামলা রয়েছে একই প্রকল্পের নরসিংদী অংশে, যা থেকে বোঝা যায় সমস্যাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, প্রস্তাবিত জমির মধ্যে এমন কিছু অংশ ছিল যা আগেই একবার অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও সরকারি জমিও এই তালিকায় ঢুকে পড়েছিল। একটি মৌজায় প্রাথমিকভাবে গুগল আর্থের সাহায্যে তৈরি রাস্তার নকশায় অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়—কোথাও রাস্তার প্রস্থ একশো ষাট ফুট আর কোথাও একশো আশি ফুট দেখানো হয়েছিল। এই এলাকায় থাকা সিএনজি স্টেশন, কলকারখানা, দোকানপাট ও বহুতল ভবনের অনেকগুলোই আগের অধিগ্রহণ করা জমির সীমানা থেকে মাত্র দশ ফুটের মধ্যে অবস্থিত ছিল বলে তদন্তে দেখা যায়। এ কারণে প্রশ্ন ওঠে, আগে অধিগ্রহণ করা জমি ব্যবহার করেই কি রাস্তার উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত জানুয়ারির শুরুতে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে অপ্রয়োজনীয় জমি বাদ দিয়ে আগের অধিগ্রহণ করা জায়গা কাজে লাগানোর সুপারিশ করা হয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি ধরা পড়েছে সরকারি জমির মালিকানা নথিভুক্তিতে। শিল্পনগরীর সরকারি জমি ও অবকাঠামো নিয়মমাফিক সরকারি সংস্থার নামে না লিখে বরং সেখানকার লিজগ্রহীতা শিল্পমালিকদের নামে ফিল্ডবহিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এমন ভুল বা কারসাজি ভবিষ্যতে ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে জটিলতা তৈরি করতে পারে, কারণ সঠিক মালিকানা নথিভুক্ত না থাকলে প্রকৃত সরকারি সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় দেখিয়ে অন্যায্য সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থেকে যায়।
জমির পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনার পরিমাপেও গরমিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলার কয়েকটি মৌজায় বাড়িঘর ও অন্যান্য অবকাঠামোর আয়তন যৌথ তদন্তের ফিল্ডবহিতে বাস্তব পরিমাপের চেয়ে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। যেহেতু স্থাপনার আয়তনের ভিত্তিতেই ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারিত হয়, তাই এই ধরনের বাড়তি হিসাব সরাসরি সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জমি চিহ্নিত করে বাদ দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তখনকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে এই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একাধিকবার বদলির চেষ্টা করা হয়, মোট চার দফায়। শেষ পর্যন্ত জেলার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোনের পর তাঁকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে বদলি করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এই ঘটনা থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে। প্রথমত, শুরুতে সাড়ে চোদ্দ একরের মতো জমির প্রয়োজনীয়তা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, আগে অধিগ্রহণ করা জমি, সরকারি জমি এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি কীভাবে নতুন প্রস্তাবে ঢুকে পড়ল। তৃতীয়ত, জমি ও স্থাপনার পরিমাপ শুরুতেই সঠিকভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চূড়ান্ত হিসাবে সাড়ে চার একর জমি বাদ পড়ার ফলে যে একশো দশ কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, তার বিপরীতে প্রশ্ন থেকে যায়—শুরুতেই যদি সঠিক পরিমাপ ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা হতো, তাহলে এত বিশাল অঙ্কের বাড়তি প্রস্তাব তৈরি হতো কি না।
বিশ্লেষকদের মতে, একই প্রকল্পের বাকি সাতটি মামলাতেও প্রাথমিক প্রস্তাব, নকশা এবং মাঠ পর্যায়ের পরিমাপ পাশাপাশি রেখে যাচাই করলে সামগ্রিক চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বদলির সঙ্গে এই সিদ্ধান্তগুলোর কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক পর্যায়ে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে শুনেছেন, তবে তা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো তাঁর কাছে পৌঁছেনি। তিনি আশ্বস্ত করেন, তদন্ত কমিটির উত্থাপিত সব ত্রুটি-বিচ্যুতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একই জমি পুনরায় অধিগ্রহণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

