গবেষণাহীন চিত্রনাট্যে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ভুল উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার ঝড়
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও’-এর আবেগঘন পঙক্তি ধার করে নাম রাখা নাটক ‘পথের সাথীকে চিনে নিও’ মুক্তির চার দিনের মধ্যেই ৫১ লাখেরও বেশি ভিউ পেয়েছে বটে, তবে এর সিংহভাগ দর্শক-প্রতিক্রিয়াই প্রশংসার বদলে বিদ্রূপ ও তীব্র সমালোচনায় ভরা। জুবায়ের ইবনে বকর পরিচালিত এবং ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত নাটকটি নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসন কাঠামো সম্পর্কে নাট্যকারের স্থূল অজ্ঞতা।
গল্পে কী দেখানো হয়েছে
নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র মঈন খান (মুশফিক আর ফারহান) দরিদ্র থাকার কারণে প্রেমিকার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে যায়। পরবর্তীতে সে বিসিএস ক্যাডার হয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) পদ পায় – এই প্রতিষ্ঠা-প্রতিশোধের আখ্যানই নাটকের মূল চালিকাশক্তি। শাহজাহান সৌরভের রচনায় নাটকটিতে আরও অভিনয় করেছেন অর্চিতা স্পর্শিয়া, জয়নাল জ্যাক, মিলি বাসার ও আরকে রেজা। সংগীত পরিচালনায় সালাম জিম।
যেখানে হোঁচট খেল চিত্রনাট্য
মুক্তির পরপরই সচেতন দর্শকরা একের পর এক তথ্যগত অসংগতি চিহ্নিত করেছেন। নাটকে দেখানো হয়েছে, চাকরির একেবারে প্রথম দিনেই মঈন ইউএনও পদে যোগদান করে যা বাস্তবে সম্পূর্ণ অসম্ভব। প্রশাসন ক্যাডারে বছরের পর বছর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে পদোন্নতির মাধ্যমেই কেউ ইউএনও হতে পারেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি স্থূল ভুল – নাটকে মঈনের পদকে বলা হয়েছে ‘অ্যাসোসিয়েট ম্যাজিস্ট্রেট’, বাংলাদেশের সরকারি চাকরি কাঠামোয় এমন কোনো পদেরই অস্তিত্ব নেই। নামফলকে উত্তরাকে উপজেলা হিসেবে দেখানো নিয়েও ক্ষুব্ধ হয়েছেন দর্শকরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক দর্শক মন্তব্য করেছেন, নাটক নির্মাণের আগে বিষয়বস্তু নিয়ে ন্যূনতম পড়াশোনা বা অনুসন্ধানও করা হয়নি বলে মনে হচ্ছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বর্তমান যুগে একটি এআই টুলের সহায়তা নিলেও সঠিক তথ্য সহজে পাওয়া যায়– তারপরও কেন এই অবহেলা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এর কিছুদিন আগেই আরেকটি জনপ্রিয় নাটকে পররাষ্ট্র ক্যাডার নিয়ে একই ধরনের ভুল উপস্থাপনা সমালোচিত হয়েছিল।
সামাজিক কুপ্রভাব: হাসিঠাট্টার চেয়েও গভীর
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ভুল উপস্থাপনার প্রভাব নিছক অনলাইন হাসিঠাট্টায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর কুপ্রভাব বহুমুখী—
সংগ্রামী চাকরিপ্রার্থীদের অবমূল্যায়ন: লাখো তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে বিসিএস প্রস্তুতি নেন। তাদের দীর্ঘ ও কষ্টার্জিত পথকে এক লহমায় ‘প্রথম দিনেই ইউএনও’ বানিয়ে দেখানো এই বাস্তবতাকে লঘু করে তোলে।
ভুল প্রশাসনিক ধারণার বিস্তার: বিপুলসংখ্যক দর্শক সরকারি প্রশাসনের প্রকৃত কাঠামো সম্পর্কে অবগত নন। জনপ্রিয় মাধ্যমে প্রচারিত এই ভুল তথ্য তাদের মনে দীর্ঘমেয়াদী ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
তরুণ দর্শকদের বিভ্রান্তি: চাকরিপ্রার্থী তরুণরাই এ ধরনের কনটেন্টের একটি বড় অংশ দেখেন। অসতর্কভাবে গ্রহণ করা ভুল তথ্য তাদের প্রস্তুতি-সংক্রান্ত ধারণাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
শিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ: একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, নাট্যনির্মাণে তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি, যা পুরো মাধ্যমটির মান নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
ভুল তথ্যের বাণিজ্যিক সাফল্য: বিপুল ভিউ সংখ্যা প্রমাণ করে, পরিচিত মুখ ও আবেগি শিরোনামে মোড়ানো হলে ভুল তথ্যও বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে; যা ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বজ্ঞানহীন নির্মাণকে উৎসাহ জোগাতে পারে।
নির্মাতাদের প্রতিক্রিয়া নেই
এত সমালোচনার পরও নাটকটির নির্মাতা বা অভিনয়শিল্পীদের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
‘পথের সাথীকে চিনে নিও’-এর বিপুল ভিউ সংখ্যা প্রমাণ করে দর্শক টানার ক্ষমতা নাটকটির আছে, *কিন্তু দর্শকের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দিচ্ছে এই জনপ্রিয়তা এসেছে ভুল কারণে*। বিনোদনের নামে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা কেবল একটি নাটকের সুনাম নয়, পুরো নাট্যশিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ন করবে।

