সরকারি হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠি থাকলেও তা কার্যত ফাইলবন্দিই থেকে গেছে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। প্রায় বিশজনের একটি দালাল চক্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গ্রাম থেকে সেবা নিতে আসা প্রান্তিক রোগীদের জিম্মি করে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে, তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় তারা সরাসরি দালালদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তারপরও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় সম্প্রতি আটজন দালালকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের নিয়মিত কার্যক্রম শুরুর আগে ও শেষে চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এমনকি অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও যোগসাজশে সরকারি বরাদ্দের ওষুধ খোলাবাজারে বিক্রি করছেন।
জানা গেছে, ২০০৬ সালে পাঁচশো শয্যা নিয়ে চালু হওয়া এই হাসপাতালটি ২০১৯ সালে সম্প্রসারিত হয়ে বারোশো শয্যায় উন্নীত হয়, এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আরও সম্প্রসারণের প্রশাসনিক অনুমোদন পেয়ে শয্যা সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আঠারোশোতে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোগী, বিশেষত গ্রামের হতদরিদ্র মানুষজনই এখানকার সেবাগ্রহীতাদের বড় অংশ। কিন্তু হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা কিছু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই দালাল চক্রের কারণে প্রতিদিনই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রের সদস্যরা প্রতিদিন ভোরে হাসপাতাল চত্বরে অবস্থান নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তার স্বজনদের টার্গেট করেন। ভালো চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নিজেদের পছন্দের ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আরেকজন দালাল ভুয়া চিকিৎসক সেজে বিভিন্ন পরীক্ষা করান এবং মোটা অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেন। রোগীর স্বজনরা প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে টের পান যে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
কার্যক্রম এখানেই থামে না। বিকেলে হাসপাতালের নিয়মিত সেবা শেষ হওয়ার পর দালালরাই কার্যত হাসপাতাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা কম দামে ওষুধ পাওয়ার প্রলোভন দিয়ে রোগীদের নিজেদের নির্দিষ্ট ফার্মেসিতে নিয়ে গিয়ে তিনগুণ বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করে। প্রশাসন এসব বিষয় জানলেও কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকায় চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা জানান, হাসপাতাল ঘিরে সাতটি ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রায় বিশজন দালাল সক্রিয়। তিনি জানান, নিয়ম অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের দেড় থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে বেসরকারি ক্লিনিক স্থাপন নিষিদ্ধ, কিন্তু হাসপাতাল থেকে কয়েকশো গজের মধ্যেই লাইসেন্সবিহীন এই ক্লিনিকগুলো গড়ে উঠেছে।
ভুক্তভোগী এক রোগীর স্বজন জানান, তার স্ত্রী জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রতিদিন সাতশো থেকে আটশো টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে তাকে, যদিও হাসপাতাল থেকে সাধারণ জ্বরের ওষুধ ছাড়া প্রায় কিছুই দেওয়া হয়নি। দিনমজুর এই ব্যক্তি বলেন, কম খরচের আশায় সরকারি হাসপাতালে এসেও তার হাজার হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।
অস্ত্রোপচার কক্ষেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে—দায়িত্বরতদের যোগসাজশে বহিরাগতদের মাধ্যমে বেশি দামে অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য করা হয় রোগীদের। এ ছাড়া হাসপাতালের ভেতরে একটি চিকিৎসক ক্লাব থাকার বিষয়েও অভিযোগ তুলেছেন রোগীর স্বজনরা, যেখানে দাবি করা হয়েছে চিকিৎসকরা সেবা না দিয়ে বিভিন্ন খেলায় সময় ব্যয় করেন, যার ফলে রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, হাসপাতাল এলাকায় সক্রিয় কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্লিনিক ঘিরে প্রায় বিশজনের একটি নির্দিষ্ট দালাল চক্র কাজ করছে। ধুনট উপজেলা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী রোগী জানান, তিনি পেটে পাথরের অস্ত্রোপচারের জন্য ভর্তি হতে এসে একজন দালালের প্রলোভনে পড়ে ভুয়া চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করান এবং মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করেন। পরে প্রকৃত হাসপাতালে পরীক্ষার কাগজপত্র দেখানোর পরই তিনি বুঝতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি প্রশাসনের কাছে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান, যাতে তার মতো আর কোনো দরিদ্র রোগী এই চক্রের ফাঁদে না পড়েন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের একজন উপ-পরিচালক জানান, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় সরাসরি ব্যবস্থা নিতে না পারলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ইতিমধ্যে আটজন দালালকে আটক করা হয়েছে এবং বিষয়টি জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন ও র্যাবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে, যাতে তারা নিয়মিত অভিযান চালান। এ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তির সময় রোগীর জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক স্বজনকেই প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিরা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন। তিনি মনে করেন, পর্যাপ্ত সংখ্যক আনসার সদস্য মোতায়েন করা হলে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমে আসবে।

