পুরান ঢাকার স্বামীবাগ-সায়েদাবাদ এলাকার একসময়ের প্রাণবন্ত ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কটি এখন পরিণত হয়েছে ময়লার গাড়ির স্তূপে। যেখানে একদা শিশুদের হাসি, রাইডের ঘণ্টাধ্বনি আর সবুজ গাছপালার মাঝে মানুষের অবসর কাটানোর দৃশ্য দেখা যেত, সেখানে এখন সারি সারি বর্জ্য বহনকারী গাড়ি, লোহালক্কড় আর নানা যান্ত্রিক সরঞ্জামের স্তূপ। নেই কোনো দোলনা, নেই কোনো রাইড, নেই সেই চেনা সবুজও।
সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধলপুর এলাকায় বড় পরিসরে একটি গাড়ি রাখার গ্যারেজ নির্মাণ চলছে। সেই নির্মাণকাজ শেষ হলে সায়েদাবাদের এই জায়গা থেকে ময়লার গাড়িগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে জায়গাটি খালি হওয়ার পর তা আবার পার্ক হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়া হবে কি না, এ ব্যাপারে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
স্বামীবাগ ও সায়েদাবাদের সংযোগস্থলে লেভেলক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে ২০০২ সালে এই পার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিল সায়েদাবাদ পার্ক নামেই। এক সময় এখানে ছিল ট্রেন রাইড, ভয়েজার বোর্ড, প্যারাট্রুপার, টুইস্টার, মিনি ট্রেন, ফেরিস হুইলের মতো প্রায় বিশটি বিনোদনমূলক রাইড। পার্কের চারপাশে সবুজ গাছগাছালিও ছিল, যেখানে শুধু শিশুরাই নয়, বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভোগা মানুষও প্রতিদিন হাঁটাচলা করতে আসতেন।
এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, পার্কটি যেখানে গড়ে উঠেছিল, সেটি আগে ছিল একটি বিশাল পুকুর। পরবর্তীতে এক ব্যক্তি জায়গাটি লিজ নিয়ে মাটি ভরাট করে সেখানে পার্ক নির্মাণ করেন। সে সময় সায়েদাবাদ, স্বামীবাগ ও যাত্রাবাড়ীর মানুষের ভিড়ে জায়গাটি সরগরম থাকতো নিয়মিত।
তবে পরিস্থিতি বদলে যায় গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী উড়ালসড়ক নির্মাণের সময়। নির্মাণকাজের ধুলাবালি, জলাবদ্ধতা আর যোগাযোগ বিপর্যয়ের কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। উড়ালসড়ক চালু হওয়ার পরও যানজট, ভাঙা সড়ক আর অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে সেই আগের জনসমাগম আর ফিরে আসেনি।
এরপর পার্ক পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালে তৎকালীন মেয়রের আমলে এই জায়গাটি ময়লার গাড়ি রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহার শুরু হয়, যদিও তার আগে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পাশের একটি গ্যারেজ এলাকায় এসব গাড়ি রাখা হতো।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ তখনকার মেয়র ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদনও জমা দিয়েছিলেন, যেখানে বাড়ির মালিক ও প্রবীণ ব্যক্তিরাও অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আবেদন কাজে আসেনি এবং পার্কের জায়গাতেই তৈরি হয় ময়লার গাড়ির গ্যারেজ।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরো চত্বরটি এখন এবড়োখেবড়ো, কাদাপানি জমে থাকা এলাকা, যেখানে বিশৃঙ্খলভাবে রাখা আছে অসংখ্য ময়লার গাড়ি। বাতাসে ভেসে বেড়ায় দুর্গন্ধ। কিছু গাছ এখনো টিকে থাকলেও সেগুলোর অবস্থাও খুব ভালো নয়—স্থানীয় কর্মীদের ভাষায়, ধীরে ধীরে গাছগুলো মরে যাচ্ছে। গ্যারেজে কর্মরত এক ব্যক্তি জানান, এখানে সাধারণত একশ থেকে দেড়শটি গাড়ি সব সময় রাখা থাকে, এবং আশপাশের বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক তীব্র যানজটের কারণে গাড়ি নিয়ে আসা-যাওয়া করাটাই বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বামীবাগের দীর্ঘদিনের এক বাসিন্দা স্মৃতিচারণ করে বলেন, বর্তমানে যেখানে ময়লার গাড়ি রাখা হয়, তার পাশে একসময় ছিল একটি বড় পুকুর, যা ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছিল পার্কটি এবং সেখানে ছিল প্রচুর গাছপালাও। তাঁর কথায়, উড়ালসড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই পার্কে মানুষের আসা কমতে শুরু করে, এবং একসময় পার্কটি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। ময়লার গাড়ি রাখার প্রসঙ্গে তিনি জানান, শুরুর দিকে দুর্গন্ধে এলাকায় টেকা কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং এলাকাবাসী আপত্তি তুলেছিলেন, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি—এখন সবাই একরকম মানিয়ে নিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, পার্কটি সক্রিয় থাকাকালীন এটি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে একখণ্ড স্বস্তির জায়গা, যেখানে সব বয়সী মানুষ সময় কাটাতে পারতেন। আজ সেই জায়গায় জঞ্জাল আর দুর্গন্ধের ভারে সেই পরিবেশ সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে।
সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের একজন প্রধান কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সায়েদাবাদ ও ধলপুর এলাকায় একটি প্রকল্পের কাজ চলমান আছে, যা শেষ হলে ময়লার গাড়িগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু জায়গাটি খালি হওয়ার পর সেখানে পার্ক নির্মাণ করা হবে কি না, তা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো নেই। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ধলপুরের প্রকল্প শেষ হয়ে গাড়িগুলো সেখানে স্থানান্তরিত হওয়ার পরই এই জায়গার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা সম্ভব হবে—তা পার্ক হতে পারে, বা অন্য কোনো স্থাপনাও হতে পারে, যার সিদ্ধান্ত নেবেন তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক বা মেয়র।
ঢাকা শহরে জায়গার সংকট নিয়ে তিনি বলেন, নতুন করে জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই বিদ্যমান পুরোনো জায়গা এবং দখলমুক্ত করা জায়গাগুলো নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। তিনি জানান, বিভিন্ন পার্ক ও খেলার মাঠ দখলমুক্ত করে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে এবং নতুন প্রকল্পও নেওয়া হচ্ছে, যার দৃশ্যমান ফল অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সিটি করপোরেশনের পরিবহন বিভাগের একজন ব্যবস্থাপক জানান, এই জায়গাটি মূলত অস্থায়ীভাবে ময়লার গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যা তখনকার মেয়র সাময়িকভাবে অনুমোদন করেছিলেন। মূল গ্যারেজ নির্মিত হচ্ছে ধলপুরে ওয়াসার প্রায় বিশ একর জমিতে, যার কাজ প্রায় অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ শেষ হতে আরও দেড় বছরের মতো সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান। এই গ্যারেজ চালু হয়ে গেলেই সায়েদাবাদ থেকে গাড়িগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে, এবং তারপর জায়গাটি নিয়ে সরকার বা সিটি করপোরেশন যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীও একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন, জানিয়েছেন যে পরিবহন বিভাগের অধীনে অস্থায়ীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গাড়িগুলো এখানে রাখা হচ্ছে এবং নির্ধারিত পার্কিং প্রকল্প শেষ হলে তা স্থানান্তরিত হবে।
এই পার্কের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সায়েদাবাদের আরও একটি হারিয়ে যাওয়া পার্কের ইতিহাসও। দক্ষিণ ও উত্তর সায়েদাবাদের পঞ্চাশ হাজারের বেশি বাসিন্দার জন্য একসময় এটিই ছিল একমাত্র খোলা জায়গা। ১৯৮০-এর দশকে অল্প জমির ওপর গড়ে তোলা এই পার্কে ছিল দোলনা ও স্লাইড, আর বড়দের জন্য ছিল বসার বেঞ্চ। বর্তমানে সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান উড়ালসড়ক নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তিনতলা কার্যালয় ভবন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১৯৯০-এর দশকেই এই পার্কের জায়গায় প্রথম ময়লা ফেলা শুরু হয়েছিল, পরে সেখানে গাড়ি পার্কিং এবং একটি গণশৌচাগার নির্মিত হয়। ২০০৭ সালের শুরুতে কয়েকটি দোকান ও শৌচাগার উচ্ছেদ করা হলেও, ২০১০ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের জন্য শেড এবং তিনতলা কার্যালয় নির্মাণ করে এবং সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেয়, ফলে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যায়।
উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় সিটি করপোরেশনের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে এই ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া হয়েছিল, যার শর্ত ছিল কাজ শেষে জায়গাটি সংস্কার করে শিশুদের জন্য রাইড স্থাপন করে সিটি করপোরেশনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু উড়ালসড়কের কাজ শেষ হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি, এবং জায়গাটি আজও পার্কে রূপান্তরিত হয়নি।
দীর্ঘদিনের এক বাসিন্দা স্মরণ করেন, উড়ালসড়ক নির্মাণের আগে থেকেই এই জায়গায় ময়লা ফেলা শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সেখানে নির্মিত হয় ভবন—আজও একই অবস্থায় রয়ে গেছে জায়গাটি। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁকে সরকারিভাবে খতিয়ে দেখতে হবে—সেখানে থাকা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কী চুক্তি বা সমঝোতা আছে এবং তার মেয়াদ কতদিনের, তা কাগজপত্র পরীক্ষা করেই জানানো সম্ভব। তিনি জানান, মেয়াদ শেষ হলে সিটি করপোরেশন অবশ্যই জায়গাটি নিজ জিম্মায় নিয়ে নেবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

