কুমিল্লার ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তিন কিশোরের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
জবানবন্দিগুলো বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের আগের পরিকল্পনা, পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া এবং হামলার ক্ষেত্রে কিছু মিল পাওয়া গেলেও যাতায়াত পথ, ঘটনাস্থল ত্যাগ ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাদের বর্ণনায় কিছু ভিন্নতা রয়েছে।
আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল এবং ঘটনার দিন ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চারজন একই জায়গা থেকে পাহাড়ে যাননি; প্রত্যেকের জবানবন্দিতে যাত্রাপথ ও সাক্ষাতের বর্ণনায় পার্থক্য দেখা গেছে।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি তাকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে অর্থাৎ তার চাচা শাহ আলমের পাহাড়ে নিয়ে যান।
অন্যদিকে, অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, দুপুর ২টার পর কোটবাড়ি বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং সন্ধ্যার আগে সে আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই সে ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।
তৃতীয় কিশোরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার সঙ্গে দেখা হলে তাকেও হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয় এবং বিকেল ৪টার পর তারা পাহাড়ে গিয়ে তুহিন ও অপ্রতিমকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে। পাহাড়ে পৌঁছে তারা কিছু সময় গল্প ও আড্ডায় অংশ নেয়।
তিন আসামির জবানবন্দিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে—হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগে অপ্রতিমের মোবাইল ফোনটি তার কাছ থেকে নেওয়া হয়।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের ভাষ্যমতে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে সে তা দেয় এবং কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর তুহিনের হাতে তুলে দেয়।
তুহিনের জবানবন্দিতেও ফোনটি নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। ফোনটি ফেরত চাওয়ায় অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে অপ্রতিমকে থাপ্পড় দেন এবং পাশে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন।
তিন জবানবন্দিতেই তুহিনের এই প্রথম আঘাতের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, আঘাতের পর তিনি অন্য দুজনকে অপ্রতিমকে মারতে বলেন।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে আসামিদের চলে যাওয়ার বর্ণনায় ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে।
তুহিনের ভাষ্যমতে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।
অপ্রতিমের দোকানের কর্মী কিশোরের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর সে ও তার কিশোর বন্ধু একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে আসে এবং তখন তুহিন সেখানে ছিলেন।
পক্ষান্তরে, তৃতীয় কিশোর জানিয়েছে যে সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে ঘটনাস্থল ছেড়েছে এবং তুহিন অন্য দিকে চলে গেছেন।
হত্যাকাণ্ডের পরের ঘটনাতেও আসামিদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে। তুহিন জানিয়েছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা ফোন করে খোঁজ নেওয়ার পর তিনি এক বন্ধুকে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় খুঁজতে যান।
অপ্রতিমের দোকানের কর্মী কিশোর জানিয়েছে, সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয় এবং পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়।
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়। এদিকে তুহিনের জবানবন্দিতে তার এক বন্ধুর বিষয়ে নতুন তথ্য এসেছে।
তুহিন জানান, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি ওই বন্ধুকে ডেকে আনেন এবং তাকে পুরো ঘটনা জানান; এমনকি ওই বন্ধু হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকেই জানত। তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে এই বন্ধুর সম্পৃক্ততার কথা আসেনি। সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ না নিলেও তথ্য গোপনের অভিযোগে পুলিশ ওই বন্ধুকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রথমে তুহিনকে শনাক্ত করে পুলিশ এবং পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের বিষয়ে তথ্য পায়। আদালতের দেওয়া তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পরিকল্পনা, পাহাড়ে নেওয়া, ফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে মিল থাকলেও হত্যার পর ঘটনাস্থল থেকে কে কোথায় গেছে, তুহিনের বন্ধুর সম্পৃক্ততা কতটা এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কিনা—সেসব বিষয় তদন্তসাপেক্ষ।
পুলিশ জানিয়েছে, জবানবন্দির তথ্যগুলো অন্যান্য সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও উদ্ধার হওয়া আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হচ্ছে, যা তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র নিশ্চিত করবে।

