২০১৪ সালের জুনে গাবতলীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ফরমালিন থাকার অভিযোগে ১০০ টন আমসহ বিপুল পরিমাণ ফল ধ্বংস করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিসিএসআইআরের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় যে, ফলের ভেতরে ফরমালিন মাপতে যে ‘ফরমালডিহাইড মিটার জেড-৩০০’ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা মূলত বাতাসের ফরমালডিহাইড পরিমাপের জন্য তৈরি। খাদ্যের ওপর প্রয়োগের জন্য এই মিটারের কোনো অনুমোদনই ছিল না। সম্প্রতি প্রকাশিত ব্রডশিট এর এক বিস্তারিত অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে এই অকার্যকর মিটারের রিডিংকে কেন্দ্র করে দেশে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফরমালিনের একটি কাল্পনিক ভীতি তৈরি করা হয়েছিল। অথচ যে রাসায়নিক প্রোটিনহীন ফলে কোনো কাজই করে না, সেটিকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদ নষ্টের উৎসব চললেও মানুষের খাবারের আসল বিষাক্ত উপাদানগুলো রয়ে গেছে নিয়মিত নজরদারির বাইরে।
ভুল মিটারের ফরমালিন আতঙ্ক ও আইনি সত্যতা
উক্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১২ সালে মৎস্য অধিদপ্তর প্রায় এক কোটি টাকায় আমেরিকার এনভায়রনমেন্টাল সেন্সরস কোম্পানির তৈরি ৮০টি জেড-৩০০ মিটার কিনে সারা দেশে পাঠায়। এর দেখাদেখি এফবিসিসিআই, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও একই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে। পলিথিন ব্যাগে ফল ভরে ভিতরের বাতাসে মিটারের সেন্সর ধরে ফরমালিন পরিমাপের এই আজগুবি পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে ২০১৪ সালের আম মৌসুমে শত শত টন ফল ধ্বংস করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ খাদ্যপণ্য আমদানিকারক সমিতির রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে বিসিএসআইআর পরীক্ষা করে জানায়, প্রাকৃতিকভাবে ফলে তৈরি হওয়া ফরমালডিহাইড, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তনের কারণেও এই মিটারে ভুল রিডিং ওঠে। পরবর্তীতে জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন যে, আম বা লিচুর মতো কম প্রোটিনের ফলে ফরমালিন কাজই করে না এবং ফলে প্রাকৃতিকভাবেই নির্দিষ্ট মাত্রায় ফরমালডিহাইড উপস্থিত থাকে। অথচ ভুল মিটারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া এই অযৌক্তিক ভীতি এক দশক পরও সাধারণ মানুষের মন থেকে মোছা যায়নি।
চালে আর্সেনিক ও মাংসে অ্যান্টিবায়োটিক: প্রকৃত গবেষণার ভয়াবহ চিত্র
ফরমালিনের এই কাল্পনিক আতঙ্কের বিপরীতে বাংলাদেশের প্রতিদিনের মূল খাদ্যতালিকায় বাস্তবিক এবং ভয়াবহ বিষাক্ততার প্রমাণ ল্যাব পরীক্ষায় বারবার উঠে এসেছে। বিশ্লেষণে উঠে আসা ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাইস অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবের এক পাইলট পরীক্ষার তথ্যানুযায়ী, বাজারের প্রতি পাঁচটি চালের নমুনার একটিতে আন্তর্জাতিক কোডেক্স সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় অজৈব আর্সেনিক পাওয়া গেছে। একই বছর যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজ, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, খামার ও বাজারের মুরগির মাংসে প্রতি সাতটি নমুনার একটিতে আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে অ্যান্টিবায়োটিক। যেখানে ইউরোপের ছয়টি দেশে ১৬ হাজারেরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করে হাজারে একটিতে এমনটি মিলেছিল, সেখানে বাংলাদেশে এই মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। গবেষণায় দেখা গেছে, খামারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ কলিস্টিন এবং অন্যান্য উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে টিকে থাকা ‘এমসিআর-১’ জিন কেবল মুরগির মাংসেই নয়, ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক বছরের কম বয়সী শিশুদের পেটেও পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্যমতে, দূষিত খাবারের রাসায়নিক বিষাক্ততায় বিশ্বজুড়ে যত মানুষ মারা যায়, তার অর্ধেকের বেশি মারা যায় অজৈব আর্সেনিক ও সীসার কারণে। অথচ বাংলাদেশে এই জাতীয় মারাত্মক উপাদানগুলো চিহ্নিত করার কাজগুলো কেবল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদেশি অনুদানের সীমিত গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
দুধ ও হলুদের কেলেঙ্কারি এবং সরকারি তদারকির সীমাবদ্ধতা
খাদ্য নিরাপত্তার এই বেহাল দশা উঠে এসেছে ২০১৯ সালের দুগ্ধ খাতের গবেষণাতেও। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের পৃথক গবেষণায় পাস্তুরিত ও কাঁচা দুধে মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও সীসা পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং আইনি পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার কাজেই বেশি ব্যস্ত ছিল। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে গঠিত চার ল্যাবের পরীক্ষায় দুধে ক্ষতিকর উপাদানের সত্যতা মিললেও পরবর্তীতে স্থায়ী কোনো সরকারি নিয়মিত পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়নি। একইভাবে ২০১৯ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় হলুদে ক্ষতিকর লেড ক্রোমেট মেশানোর প্রমাণ পাওয়ার পর আংশিক অভিযান চালিয়ে কারখানাগুলোতে সীসার ব্যবহার কমানো গেলেও, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ তা দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে পারেনি।
রপ্তানি বনাম স্থানীয় বাজার: বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ করণীয়
পরিসংখ্যান বলছে, রাষ্ট্র চাইলে এবং আন্তর্জাতিক চাপ থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। ২০০৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের চিংড়িতে নিষিদ্ধ উপাদান পাওয়ার পর সরকার আইন কড়া করে কঠোর পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করেছিল, যা আজও সফলভাবে বহাল আছে। একইভাব ২০২৬ সালে শিমের ওপর ইইউ বাড়তি পরীক্ষার নিয়ম জারি করেছে। অর্থাৎ রপ্তানি পণ্যের মান বজায় রাখতে রাষ্ট্র নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষা চালালেও, দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের দৈনিক ব্যবহৃত চাল, ডাল, দুধ, মাংস ও সবজি পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী সরকারি তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
২০১৩ সালে তৈরি হওয়া বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এখনও নিজস্ব আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃত ল্যাবের অভাবে ভুগছে এবং তাদের কার্যক্রম মূলত খালি চোখে দেখা যাওয়া প্রশাসনিক অপরাধ ও জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গবেষক ও নীতি বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, খাদ্য নিরাপদ কি না তা জানার প্রাথমিক শর্ত হলো প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত ও বিক্রিত খাদ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ নমুনা ল্যাবে পরীক্ষা করা এবং সেই কেমিক্যাল টক্সিসিটির বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনা। সাময়িক অভিযান বা ভুল মিটারের আতঙ্ক ছড়িয়ে নয়, বরং বৈজ্ঞানিক ল্যাব পরীক্ষার তথ্য নিয়মিত মানুষের সামনে প্রকাশ করার মাধ্যমেই কেবল সত্যিকারের নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
সূত্র স্বীকার: এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর সূচনা ব্রডশিটে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ থেকে।

